মানচিত্রের আগে ভূগোল
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে বা সংসদে যতটা নির্ধারিত হবে, তার চেয়ে বেশি হবে নদীর উজানে, পলির হিসাবে আর উপসাগরের ঢেউয়ে।
আমাদের রাজনৈতিক বিতর্ক গত পাঁচ দশক ধরে ঘুরপাক খেয়েছে একটি প্রশ্নে: আমরা বাঙালি, না বাংলাদেশি? এক পক্ষ উত্তর খুঁজেছে ভাষায়, অন্য পক্ষ ধর্মে আর ভূখণ্ডে। দুই উত্তরেরই ঐতিহাসিক যুক্তি আছে। কিন্তু দুটোই একটা জিনিস প্রায় ভুলে গেছে, যেটা ভাষা আর ধর্ম দুটোরই আগের: এই মাটি নিজেই।
আমাদের সভ্যতার নাম তাই এখানে প্রস্তাব করা হচ্ছে বাংলা সভ্যতা, আর আমাদের পরিসরের নাম বাংলা দুনিয়া। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক ভূ-প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিসর। ইতিহাস-পূর্ব বেঙ্গল বেসিন, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার পলিতে গড়া বেঙ্গল ডেল্টা আর হাজার বছরের বঙ্গোপসাগর মিলে এই পরিসর আমাদের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির কাঠামো তৈরি করেছে।
এটা কোনো মানচিত্র বদলের দাবি নয়, সীমান্ত পেরোনোর আকাঙ্ক্ষাও নয়। এটা একটা দেখার পদ্ধতি। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সার্বভৌম ও সীমানাবদ্ধ, কিন্তু তার বাঁচা-মরা নির্ভর করে সীমানার বাইরের পাহাড়, হিমবাহ, নদী আর সমুদ্রের ওপর। সেই নির্ভরতা না বুঝে সার্বভৌমত্বের কথা বলা অর্ধেক কথা বলা।
যে মাটি নদী বানিয়েছে
বাংলাদেশ একটা দেশ হওয়ার অনেক আগে ছিল একটা অববাহিকা। ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে দেশের বেশিরভাগ ভূভাগই বঙ্গীয় অববাহিকা বা বেঙ্গল বেসিনের অংশ। ভারতীয় প্লেট অ্যান্টার্কটিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উত্তরে সরে এসে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে, আর সেই সংঘর্ষের নিচু খাদে কোটি বছর ধরে জমেছে পলি। এই অববাহিকায় প্রায় ২০ কিলোমিটার পুরু পাললিক স্তর রয়েছে।
সেই পুরনো খাদের ওপর আজকের বেঙ্গল ডেল্টা। গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমে গড়া এই অববাহিকাকে বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ অববাহিকা ধরা হয়। হিমালয় ও আশপাশের পাহাড় থেকে নদীগুলো প্রতি বছর ১০০ কোটি টনের বেশি পলি বয়ে আনে। এই পলিই আমাদের মাটি, আমাদের ধান, আমাদের চর, আমাদের উপকূলের নতুন জমি।
কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের মৌলিক দুর্বলতা। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার মোট আয়তন প্রায় ১৭ লাখ বর্গকিলোমিটার। তার মাত্র ৭ শতাংশ বাংলাদেশের ভেতরে।
| দেশ | অববাহিকার অংশ |
|---|---|
| ভারত | ৬৪% |
| চীন | ১৮% |
| নেপাল | ৯% |
| বাংলাদেশ | ৭% |
| ভুটান | ৩% |
অর্থাৎ যে পানি আর পলিতে আমরা বাঁচি, তার ৯৩ শতাংশের উৎসভূমি অন্য রাষ্ট্রের হাতে। দেশে ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী, যার ৫৪টি ভারতের সঙ্গে আর ৩টি মিয়ানমারের সঙ্গে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা পানির প্রায় ৫৪ শতাংশ দেয় ব্রহ্মপুত্র, ৩১ শতাংশ গঙ্গা আর প্রায় ১৪ শতাংশ মেঘনার উপনদীগুলো।
এই হিসাব থেকে একটা সরল কথা বেরিয়ে আসে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ। উজানে যে-ই যা করুক, তার ফল ভোগ করবে ভাটি। ভূগোল এখানে নিয়তি নয়, কিন্তু ভূগোল না বুঝে নেওয়া কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত টেকসই হয় না।
বঙ্গোপসাগর: হাজার বছরের জানালা
বাংলা দুনিয়া কখনো বদ্ধ ঘর ছিল না। তার দরজা ছিল উত্তরের পাহাড়ে নয়, দক্ষিণের সমুদ্রে। বঙ্গোপসাগর আয়তনে প্রায় ২১ লাখ ৭২ হাজার বর্গকিলোমিটার, বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর।
এই সমুদ্রমুখী ইতিহাসের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক দল সেখানে দুর্গঘেরা নগরের চিহ্ন, পরিকল্পিত রাস্তা আর বিপুল পরিমাণ ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা পেয়েছে। সেখানে পাওয়া রুলেটেড মৃৎপাত্র ও নানা ধরনের কাচ ও পাথরের পুঁতি থেকে গবেষকরা ধারণা করছেন, এই বসতির সঙ্গে রোমান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জগতের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। কেউ কেউ একে টলেমির ভূগোলে উল্লিখিত বাণিজ্যকেন্দ্র 'সৌনাগৌরা' বলে চিহ্নিত করতে চান, যদিও সেই শনাক্তকরণ এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রাচীন কাল থেকেই বাংলার বন্দরগুলো থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সরাসরি সমুদ্রপথ ছিল, আর ভারতের অন্য অঞ্চলের বণিকরাও এই বন্দর ব্যবহার করতেন। পরে বাংলা সালতানাত আর মোগল আমলে চট্টগ্রাম ও সোনারগাঁ এই সমুদ্র-বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মসলিন, চাল, লবণ আর চিনি এই পথেই পৃথিবীতে গেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশ এই সমুদ্রকে আইনিভাবে নিজের করে নিয়েছে মাত্র এক যুগ আগে। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনালে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে স্থায়ী সালিসি আদালতে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১১ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা পেয়েছে। কিন্তু সেই সমুদ্র ব্যবহারে আমরা এখনো পিছিয়ে। ২৬টি সমুদ্র ব্লকের মধ্যে ২৩টিই নিষ্ক্রিয় পড়ে আছে, অথচ প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার দ্রুত অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
যে জাতির ইতিহাস সমুদ্রে লেখা, সে আজ সমুদ্রের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে আছে। এটাই বাংলা দুনিয়ার ধারণার প্রথম সংশোধনী: আমাদের মুখ উত্তরে নয়, দক্ষিণে।
উজানের বাঁধ: ফারাক্কা থেকে মেডগ
তিনটি বড় নদীর প্রতিটির উজানে আজ এমন কোনো স্থাপনা আছে বা প্রস্তাবিত, যার নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই। বাঁধ কেবল প্রকৌশল নয়; যে পানি ছাড়ে আর আটকায়, ক্ষমতা তারই।
| স্থাপনা | নদী | নিয়ন্ত্রক | অবস্থা | বাংলাদেশের ঝুঁকি |
|---|---|---|---|---|
| ফারাক্কা ব্যারাজ | গঙ্গা | ভারত | চালু, ১৯৭৫ থেকে | শুকনো মৌসুমে প্রবাহ হ্রাস, গড়াই ও সুন্দরবনে লবণাক্ততা |
| গজলডোবা ব্যারাজ | তিস্তা | ভারত | চালু | উত্তরাঞ্চলের সেচ সংকট; পানিবণ্টন চুক্তি আজও সই হয়নি |
| টিপাইমুখ বাঁধ | বরাক (মেঘনার উৎস) | ভারত | প্রস্তাবিত | সুরমা-কুশিয়ারা ও হাওর অঞ্চলের প্রবাহ |
| নদী সংযোগ প্রকল্প (মানস-সংকোশ-তিস্তা-গঙ্গা) | ব্রহ্মপুত্রের উপনদী | ভারত | পরিকল্পিত | ব্রহ্মপুত্রের পানি গঙ্গা অববাহিকায় সরানো |
| মেডগ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প | ইয়ারলুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্র) | চীন | নির্মাণাধীন, ২০২৫ থেকে | প্রবাহ ও পলির ওপর অজানা প্রভাব |
| লোয়ার সিয়াং বাঁধ | সিয়াং (ব্রহ্মপুত্র) | ভারত | প্রস্তাবিত | মেডগের পাল্টা জলাধার; ভাটিতে দ্বিগুণ নিয়ন্ত্রণ |
ফারাক্কা আমাদের পুরনো ক্ষত। ১৯৭৫ সালে চালু হওয়া এই ব্যারাজ গঙ্গার পানি হুগলিতে সরিয়ে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য তৈরি। এর দাম দিয়েছে পদ্মা, গড়াই আর দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূল।
নতুন ক্ষতটা আসছে উত্তর থেকে। চীন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মেডগ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন দেয়, আর ২০২৫ সালে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের উপস্থিতিতে নির্মাণ শুরু হয়। পরিকল্পিত উৎপাদনক্ষমতা ৬০ হাজার মেগাওয়াট, থ্রি গর্জেস বাঁধের প্রায় তিন গুণ। নদীটি তিব্বত পেরিয়ে ভারতে ঢোকার আগে প্রায় দুই হাজার মিটার নেমে আসে, সেই ঢালই এর শক্তির উৎস। বাংলাদেশ চীনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নসহ চারটি কারিগরি নথি চেয়েছে।
ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত নন, আর এই দ্বিমতটাও জানা দরকার। সিইজিআইএস-এর নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খানের হিসাবে, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়া শুকনো মৌসুমের প্রবাহের ৭০ শতাংশ আসে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে, আর দেশের পলির অর্ধেকের বেশিও এই নদীর দান। অন্যদিকে আসামের এক ভূতত্ত্ববিদের মতে, বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের মোট প্রবাহে তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপোর অবদান মাত্র ৫ শতাংশের মতো; বাকিটা আসে ভারতের বর্ষা অববাহিকা থেকে। অর্থাৎ মেডগের সরাসরি পানি-প্রভাব হয়তো সীমিত, কিন্তু পলি আটকানো, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় বিশাল জলাধার আর ভারতের পাল্টা বাঁধ মিলিয়ে যে শৃঙ্খল তৈরি হচ্ছে, তার শেষ মাথায় বসে আছে বাংলাদেশ।
একটা জিনিস স্পষ্ট: উজানের দুই বড় শক্তি নিজেদের মধ্যে পানির প্রতিযোগিতায় নামছে, আর সেই প্রতিযোগিতায় ভাটির দেশের কোনো আসন নেই।
গঙ্গা চুক্তি ২০২৬: ঘড়ির কাঁটা
এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পানি-নিরাপত্তার একমাত্র আইনি রক্ষাকবচের মেয়াদ শেষ হতে দুই মাসও বাকি নেই। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি শেষ হবে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর।
চুক্তিটি ছিল তখনকার জন্য কূটনৈতিক সাফল্য, কিন্তু তার ভিত্তি দুর্বল। পানিবণ্টনের সূত্র ঠিক করা হয়েছিল ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের প্রবাহের হিসাব ধরে, যা আজকের জলবায়ু আর চাহিদার বাস্তবতায় অচল। নিশ্চয়তা বলতে ছিল ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সবচেয়ে সংকটের সময়ে পালাক্রমে তিনটি দশ দিনের পর্বে ৩৫ হাজার কিউসেক।
বাংলাদেশ এবার শুধু নবায়ন চাইছে না, চাইছে নতুন চুক্তি। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেছেন, ১৯৭৭ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তিতে যে 'গ্যারান্টি ক্লজ' ছিল, ১৯৯৬ সালে তা বাদ পড়ে; সেটি ফিরিয়ে আনাই এখন ঢাকার শীর্ষ অগ্রাধিকার। ১৯৭৭ সালের সেই বিধানে প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশ নির্ধারিত হিস্যার অন্তত ৮০ শতাংশ পাওয়ার নিশ্চয়তা পেত।
দিল্লির অবস্থান সংযত ও অস্পষ্ট। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বলছে, বিষয়টি যৌথ নদী কমিশনের বিদ্যমান কাঠামোতেই আলোচিত হবে। ভারতের ভেতরেও বাধা আছে: মোদি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক জনতা দল (ইউনাইটেড) চুক্তি নবায়নের বিরোধিতা করে নতুন করে আলোচনার দাবি তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারও এই চুক্তির বড় অভ্যন্তরীণ বাধা ছিল। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দিল্লি নিজের বাড়তি পানির চাহিদার কথা জানিয়েছে, এবং নতুন চুক্তি হলে তা ১০ থেকে ১৫ বছরের মতো ছোট মেয়াদের হতে পারে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা অবশ্য অন্য জায়গায়। ভারতের সঙ্গে ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে বিস্তারিত পানিবণ্টন চুক্তি আছে কেবল গঙ্গায়; কুশিয়ারায় ২০২২ সালে একটি সীমিত সমঝোতা হয়েছে, আর তিস্তা চুক্তি আজও সই হয়নি। মালিক ফিদা খান যথার্থই বলেছেন, আলোচনা শুধু ফারাক্কা পয়েন্টে আটকে না রেখে পুরো গঙ্গা অববাহিকার পানি নিয়ে ভাবতে হবে। একটা ব্যারাজের নিচে দাঁড়িয়ে দর-কষাকষি আর পুরো অববাহিকার অংশীদার হিসেবে দর-কষাকষি, দুটো এক জিনিস নয়।
জলবায়ু, লবণ ও সমুদ্রের অগ্রযাত্রা
উজান থেকে মিঠা পানি কমছে, আর ভাটি থেকে লোনা পানি উঠে আসছে। বাংলাদেশ এই দুই চাপের মাঝখানে, আর দুটো চাপ একে অপরকে বাড়িয়ে তোলে।
দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ মিটারেরও কম উঁচু। নাসা ও চীনা মহাকাশ সংস্থার প্রায় ২৫ বছরের উপগ্রহ-তথ্য বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের কিছু উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ৬০ শতাংশের বেশি দ্রুত বাড়ছে, আর বর্তমান হারে ২০৫০ সালের মধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
তবে সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার চেয়েও আগে আসছে লবণ। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলে মাটির লবণাক্ততা গড়ে ২৬ শতাংশ আর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৫৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। যেসব উপজেলায় লবণাক্ততা মাত্রা ছাড়াবে, সেখানে ধানের ফলন প্রায় ১৫.৬ শতাংশ কমবে। কিছু উপকূলীয় এলাকায় যেখানে একসময় বছরে তিনবার ধান হতো, সেখানে এখন লবণের কারণে একবারই হয়।
এখানেই পানি-রাজনীতি আর জলবায়ু-রাজনীতি এক হয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে গঙ্গার মিঠা পানি কম এলে গড়াই দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে যথেষ্ট প্রবাহ পৌঁছায় না, আর লোনা পানি আরও ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফারাক্কার প্রশ্ন তাই কেবল পদ্মার প্রশ্ন নয়; এটা সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের, খুলনার খাবার পানির আর সাতক্ষীরার ধানক্ষেতের প্রশ্ন।
জলবায়ু-উদ্বাস্তু মানুষ শেষ পর্যন্ত ঢাকা আর চট্টগ্রামের বস্তিতে এসে ওঠে। অর্থাৎ উজানের একটা ব্যারাজের সিদ্ধান্ত পৌঁছে যায় রাজধানীর নগর পরিকল্পনা, শ্রমবাজার আর রাজনৈতিক অস্থিরতা পর্যন্ত। পানি, পরিবেশ আর সমুদ্র যে আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, এটা তত্ত্ব নয়; এটা ইতিমধ্যে ঘটছে।
উপসাগরের ভূ-রাজনীতি
কয়েক দশক ধরে বিশ্বরাজনীতির চোখে বঙ্গোপসাগর ছিল এক অবহেলিত পেছনের উঠান। এখন এটি ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে এই উপসাগর একই সঙ্গে বিভাজক, সংযোজক আর সম্ভাব্য সংঘাতক্ষেত্র।
তিন বড় শক্তি এখানে তিনভাবে উপস্থিত। ভারতের জন্য বঙ্গোপসাগর তার ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি; আন্দামান-নিকোবর থেকে মালাক্কা প্রণালী পর্যন্ত তার নজরদারি বিস্তৃত। চীনের জন্য এটি মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর বিকল্প পথ, যার একটি প্রান্ত মিয়ানমারের রাখাইন উপকূল। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এখানে 'মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক' কাঠামোয় প্রভাব বাড়াতে চায়।
বাংলাদেশ এই ত্রিভুজের ঠিক মাঝখানে, অথচ তার নিজের সমুদ্রশক্তি দুর্বল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক হয়েও স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশটি একটিও গভীর সমুদ্রবন্দর সম্পন্ন করতে পারেনি, যা ২০২২ সালে এক বিশ্লেষণে বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছিল। মাতারবাড়ী এখন সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা।
পানি আর সমুদ্র এখানে একই দাবার ছক। তিস্তা মহাপরিকল্পনা তার স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশ যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সম্মত হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরের কেউ কেউ মনে করেন, চীনকে তিস্তায় যুক্ত করা ভবিষ্যৎ পানি-আলোচনায় দর-কষাকষির হাতিয়ার হতে পারে, কারণ বাংলাদেশের কয়েকটি নদীর উৎসও চীনে। আবার সমালোচকরা সতর্ক করেন, ভারতের 'চিকেনস নেক' শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি চীনের উপস্থিতি দিল্লির সঙ্গে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রশ্নটা 'কার পক্ষে যাব' নয়। প্রশ্ন হলো, তিন শক্তির প্রতিযোগিতাকে নিজের পানি, বন্দর আর সমুদ্রসম্পদের স্বার্থে কাজে লাগানোর মতো কৌশলগত সক্ষমতা আমাদের আছে কি না।
ভাষা ও ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের সীমা
বাঙালি ও বাংলাদেশি, দুই জাতীয়তাবাদই নিজের সময়ে কাজ করেছে। কিন্তু নদীর প্রশ্নে এসে দুটোই একই জায়গায় থেমে যায়।
আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদ সার্বভৌমত্বকে দেখেছে ১৯৭১-এর লেন্সে, ভারতের সঙ্গে ভাগ করা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে। বিএনপির বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ দেখেছে ভূখণ্ডের লেন্সে: সীমানার ভেতরের মানুষ দিয়ে, সীমানার বাইরের আত্মীয়তা দিয়ে নয়। প্রথমটির দুর্বলতা হলো, সে প্রতিবেশীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক মিলকে স্বার্থের মিল বলে ভুল করেছে। দ্বিতীয়টির দুর্বলতা হলো, সে সীমানার ভেতরে তাকিয়ে থেকেছে, অথচ আমাদের পানির ৯৩ শতাংশ উৎস সীমানার বাইরে।
গঙ্গা চুক্তির ইতিহাসই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সীমা দেখিয়ে দেয়। যে রাজ্যটি বছরের পর বছর এই চুক্তির সবচেয়ে বড় বাধা ছিল, সেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষও বাংলায় কথা বলে। ভাষা এক, কিন্তু ফারাক্কার পানিতে স্বার্থ আলাদা। নদী কারো মাতৃভাষা জিজ্ঞেস করে না।
ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদও এখানে কোনো উত্তর দেয় না। তিব্বতের মেডগ বাঁধ বা বরাকের টিপাইমুখ ধর্ম দেখে পানি ছাড়বে না। বরং বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আর বাংলাদেশে ইসলামপন্থী সংগঠন একে অপরকে শক্তি জোগালে সীমান্তের দুই পাশেই সংখ্যালঘুরা আরও অরক্ষিত হবে। আর এই অববাহিকায় শুধু বাঙালি মুসলমান বা হিন্দু বাস করে না: চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল, রাজবংশী, অসমিয়া, সবাই একই নদীর পানি খায়।
ন্যায্যতার খাতিরে বিপরীত যুক্তিটাও বলা দরকার। ভাষা ও ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সমর্থকরা বলবেন, একটা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে মানুষের আবেগের আঠা লাগে, আর ভাষা ও বিশ্বাসই সেই আঠা; ভূগোল দিয়ে মানুষ মিছিলে নামে না। এই যুক্তি অগ্রাহ্য করার মতো নয়। তাই এদের বাতিল করার চেয়ে, বরং এরা যথেষ্ট নয় বলা শ্রেয়। পরিচয় দিয়ে জাতি গঠন হয়, কিন্তু পরিচয় দিয়ে পানির হিস্যা আদায় হয় না।
বাংলা সভ্যতার চারিত্রিক বৈশষ্ট্য: নতুন রাজনৈতিকতার রূপরেখা
বাংলা সভ্যতার মূল শিক্ষা হলো নদীর সঙ্গে আপস করে বাঁচা। এই ব-দ্বীপের মানুষ হাজার বছর ধরে বন্যাকে শত্রু নয়, ঋতু হিসেবে দেখেছে; চর ভাঙলে নতুন চরে ঘর বেঁধেছে; সমুদ্রকে দেয়াল নয়, পথ মনে করেছে। নমনীয়তা, বহুত্ব আর বাইরের দিকে খোলা মুখ, এই তিনটিই বাংলা দুনিয়ার সভ্যতার চারিত্রিক বৈশষ্ট্য।
এই চারিত্রিক বৈশষ্ট্য-কে রাজনীতিতে রূপ দিতে হলে কয়েকটি বদল দরকার:
- পানিকে জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রে আনা। পানি এখন আর শুধু পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটা পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, কৃষি আর নগর পরিকল্পনার যৌথ বিষয়। একটা স্থায়ী, দলনিরপেক্ষ পানি-নিরাপত্তা কাঠামো দরকার, যা সরকার বদলালেও বদলাবে না।
- ব্যারাজ থেকে অববাহিকায়। দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এক পয়েন্টে আটকে থাকে। নেপাল, ভুটান, ভারত ও চীনকে যুক্ত করে অববাহিকাভিত্তিক বহুপক্ষীয় কাঠামোর দাবি তুলতে হবে, আর আন্তর্জাতিক পানি আইনের ভাষায় নিজের দাবি সাজাতে হবে।
- তথ্যের সার্বভৌমত্ব। উজানের দেশের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে দর-কষাকষি চলে না। নিজস্ব প্রবাহ-পর্যবেক্ষণ, উপগ্রহ-তথ্য বিশ্লেষণ আর জলবিজ্ঞানের গবেষণায় বিনিয়োগ ছাড়া প্রতিটি আলোচনায় আমরা অন্যের সংখ্যা নিয়ে বসব।
- সমুদ্রমুখী অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা। সমুদ্রসীমা জেতা হয়েছে, ব্যবহার হয়নি। গভীর সমুদ্রবন্দর, সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান, মৎস্য ব্যবস্থাপনা আর উপকূলরক্ষী ও নৌশক্তির আধুনিকায়ন এক সুতোয় গাঁথা।
- বহুমুখী কূটনীতি। দিল্লি, বেইজিং বা ওয়াশিংটন, কারো কক্ষপথে ঢুকে পড়া নয়; প্রত্যেকের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক, যেখানে পানি আর সমুদ্র হবে আলোচনার স্থায়ী এজেন্ডা।
- অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয়। বাংলা দুনিয়ার নাগরিক সে-ই, যে এই ব-দ্বীপে বাস করে ও এর ভবিষ্যতের অংশীদার, ভাষা বা ধর্ম যা-ই হোক। উয়ারী-বটেশ্বর থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত এই ভূমির ইতিহাস পাঠ্যক্রমে আনতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম নিজেকে নদী আর সমুদ্রের উত্তরাধিকারী হিসেবে চেনে।
- জলবায়ু অভিযোজনকে উন্নয়নের মূলধারায়। উপকূলের লবণ, চরের ভাঙন আর জলবায়ু-অভিবাসন আলাদা প্রকল্প নয়; এগুলোই আগামী দিনের উন্নয়ন-রাজনীতি।
এই রূপরেখার কোনোটিই একক দলের সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি যদি সত্যিই 'বাংলাদেশ আগে' বলে, তবে সেই বাংলাদেশের প্রথম সংজ্ঞা হওয়া উচিত: নদী, পলি আর সমুদ্রের দেশ।
শেষ কথা
আমাদের রাজনীতি এতদিন অতীত নিয়ে লড়েছে: ১৯৪৭ না ১৯৭১, বাঙালি না বাংলাদেশি। সেই লড়াই অর্থহীন নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণ। ভবিষ্যতের লড়াই হবে তিব্বতের গিরিখাতে, ফারাক্কার গেটে, তিস্তার চরে আর বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত ঢেউয়ে। সেই লড়াইয়ে ভাষার স্লোগান বা ধর্মের পতাকা একা জিতবে না।
বাংলা সভ্যতা ও বাংলা দুনিয়ার ধারণা তাই কোনো রোমান্টিক অতীতচর্চা নয়। এটা একটা বাস্তববাদী দাবি: যে মাটি পলি দিয়ে তৈরি, তার রাজনীতিও পলির হিসাব দিয়ে করতে হবে। ভূগোল আমাদের জন্ম দিয়েছে; ভূগোল না বুঝলে ভূগোলই আমাদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেবে।
তথ্যসূত্র
- শিক্ষক বাতায়ন: খনিজ সম্পদ
- Imam & Hussain, A review of hydrocarbon habitats in Bangladesh
- OSTI: Tectonics and petroleum prospects in Bangladesh
- India Water Portal: Water sharing, beyond economic concerns
- The Financial Express: Bangladesh Delta Plan 2100
- Guinness World Records: Largest bay by area
- Archaeology: Wari-Bateshwar
- Bangladesh.com: Wari-Bateshwar
- JATI: Tracing early maritime Southeast Asia and Bengal's contact
- Dhaka Tribune: Offshore exploration stalls
- Asia News Network: Bangladesh concern over Brahmaputra dam
- Open Magazine: The Mother of All Mega-Dams
- Arise: China begins building world's largest dam
- EastMojo: Lecture on Tsangpo dam
- Lowy Institute: Medog mega-dam
- ThePrint: Ganges Water Treaty irritant
- bdnews24: Bangladesh wants revised Ganges deal
- Dhaka Tribune: Anee expects new treaty
- ISAS, NUS: The Ganga Waters Treaty
- Asia News Network: Future of the Ganges Waters Treaty
- Daily Observer: Uncertainty of water sharing
- Upsc/GetMarks: Treaty explainer
- Arab News: Sea swamps Bangladesh
- World Bank: Salinity intrusion
- World Bank blog: River salinity
- Frontier Weekly: Sea-level is rising
- War on the Rocks: The Bay of Bengal and the Indo-Pacific
- ORF: India, Europe and the Bay of Bengal
- Daily Observer: Teesta feasibility study
- Daily Observer: China to send experts for Teesta
- CPR India: Not Dilli, Not Pindi
- East Asia Forum: Bangladesh's rightward shift
আরোও পড়ুনঃ একটা ফেয়ার ট্রায়াল





মন্তব্য
মন্তব্য
চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।
আলোচনায় যোগ দিন
মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।
এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।