পঁচিশে মার্চের রাত, ধানমন্ডি ৩২
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামছে। শহরের বাতাসে একটা অস্বস্তি, যেটা বোঝা যায় কিন্তু নাম দেওয়া যায় না। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ভাঙেনি, কিন্তু সেনানিবাস থেকে ট্রাক বের হওয়ার খবর আসছে। ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর সড়কের বাড়িটাতে দলের নেতারা আসছেন, যাচ্ছেন।
তাজউদ্দীন আহমদ এসেছিলেন একটা ছোট্ট খসড়া আর একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে। খসড়াটা স্বাধীনতার ঘোষণার। তিনি চেয়েছিলেন, নেতা নিজের গলায় সেটা পড়ে রাখুন, বা অন্তত একটা সই দিন। তাজউদ্দীনের নিজের বর্ণনা, যা পরে তাঁর পরিবারের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, বলছে: শেখ মুজিব চুপ করে রইলেন, তারপর রাজি হলেন না। সেই রাতে তিনি আত্মগোপনেও গেলেন না। সবাইকে পালাতে বললেন, নিজে বাড়িতে থেকে গেলেন।
মাঝরাতে পাকিস্তানি সেনারা শহরে নামল। পিলখানা, রাজারবাগ, জগন্নাথ হল। সেই রাতেই তাঁকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো। পরের নয় মাস তিনি পাকিস্তানের কারাগারে। যুদ্ধটা হলো তাঁকে ছাড়াই।
এই লেখা সেই রাত থেকে শুরু হচ্ছে, কারণ সেই রাতটা একটা প্রশ্ন ছেড়ে গেছে, যার উত্তর পঞ্চাশ বছর ধরে আমাদের দেওয়া হয়নি: যিনি যুদ্ধে ছিলেন না, তিনি কীভাবে যুদ্ধের একমাত্র মালিক হয়ে উঠলেন? আর মালিক হয়ে সেই যুদ্ধের অঙ্গীকারগুলোর সঙ্গে কী করলেন?
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো বায়বীয় জিনিস নয়। সেটা লিখিত আছে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে তিনটি শব্দে তার সারকথা: সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচার। এই তিনটি শব্দকে মাপকাঠি ধরলে একটা অস্বস্তিকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ছাড়া উপায় থাকে না। স্বাধীন বাংলাদেশে এই তিনটি অঙ্গীকার প্রথম যিনি নিজের হাতে ভাঙলেন, তিনি কোনো রাজাকার বা আলবদর নন। তিনি স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান। সেই অর্থে তিনিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রথম গাদ্দার। এই লেখা সেই অভিযোগের নথি।
পাকিস্তানের সৈনিক থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার
গল্পটা শুরু কলকাতায়। চল্লিশের দশকে ইসলামিয়া কলেজের এক তরুণ ছাত্র, সোহরাওয়ার্দীর অনুগত কর্মী, মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনের উৎসাহী সৈনিক। পাকিস্তান সৃষ্টিতে তাঁর অবদান নিয়ে তিনি নিজে কখনো লজ্জিত ছিলেন না। এটা অপরাধ নয়, কিন্তু কথাটা মনে রাখা দরকার, কারণ পরের প্রচারে তাঁকে এমনভাবে আঁকা হয়েছে যেন জন্ম থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন।
ভাষা আন্দোলনে তিনি আটটচল্লিশে কারাবরণ করেছিলেন, এটা সত্যি। কিন্তু বায়ান্নর সেই ফেব্রুয়ারিতে তিনি ছিলেন জেলে। বদরুদ্দীন উমরের মতো ভাষা আন্দোলনের গবেষকেরা বহুবার বলেছেন, বায়ান্নর আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা পরের দলীয় ইতিহাসে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। ইতিহাস লেখার এই অভ্যাসটাও তাঁর উত্তরাধিকার। অন্যের অর্জন এক মানুষের খাতায় তোলার অভ্যাস।
ছেষট্টির ছয় দফা ছিল পাকিস্তানের ভেতরে স্বায়ত্তশাসনের দাবি, স্বাধীনতার নয়। সত্তরের নির্বাচন হয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের, আর সেই নির্বাচনে জিতে তিনি দাবি করেছিলেন পাকিস্তানের সরকার গঠনের অধিকার। মার্চের পুরো তিন সপ্তাহ ধরে, যখন ছাত্ররা স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে ফেলেছে, তখনও তিনি ইয়াহিয়া আর ভুট্টোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির আলোচনায় বসছিলেন। তাজউদ্দীন নিজেই পরে বলেছিলেন, বিপুল জনমত স্বাধীনতার পক্ষে থাকার পরও শেখ মুজিব আরও একবার রাজনৈতিক মীমাংসার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
সাতই মার্চের ভাষণও এই দ্বিধার বাইরে নয়। সম্মোহনী ভাষা, কিন্তু শেষে চারটি শর্ত: সামরিক আইন তুলতে হবে, সেনা ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, হত্যার তদন্ত করতে হবে, আর জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা দিতে হবে। অর্থাৎ দরজা খোলা রাখা হলো আপোষের দিকে। সেদিন ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড স্বস্তি পেয়েছিলেন বলে পরে লেখা হয়েছে, কারণ মুজিব সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
যে যুদ্ধে তিনি ছিলেন না
পঁচিশে মার্চের রাতের পর দলটা ছিল দিকহারা। নেতা নির্দেশ দিয়ে যাননি, ঘোষণা রেখে যাননি, নিজে ধরা দিয়েছেন। গ্রেপ্তারের আগে তিনি ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের এই দাবি পরে সংবিধানেও ঢুকেছে। কিন্তু সেই রাতে যিনি টেপ রেকর্ডারে একটা লাইন বলতে রাজি হননি, তিনি গোপনে ওয়্যারলেস বার্তা পাঠিয়েছিলেন, এই দাবির পক্ষে সমকালীন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কিত। দেশের মানুষ রেডিওতে যে ঘোষণা শুনেছিল, তা এসেছিল ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে, এক মেজরের কণ্ঠে।
তারপর যা হলো, তা হলো তাঁকে ছাড়াই। তাজউদ্দীন আর আমির-উল ইসলাম পায়ে হেঁটে সীমান্ত পেরোলেন। প্রবাসী সরকার গড়লেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখলেন। অনুপস্থিত মানুষটিকে রাষ্ট্রপতি করে যুদ্ধটাকে তাঁর নামে চালালেন। সেক্টরে সেক্টরে লড়লেন বাঙালি সৈনিক, ইপিআর, ছাত্র, কৃষক। লড়লেন বামপন্থীরাও, সিরাজ সিকদারের মতো প্রকৌশলী বিপ্লবীও।
অথচ এই যুদ্ধের ভেতরেই আরেকটা ছোট যুদ্ধ চলছিল। মুজিবের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণি, সঙ্গে তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক আর সিরাজুল আলম খান, ভারতে গড়ে তুললেন আলাদা এক বাহিনী: মুজিব বাহিনী। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র'-এর সহায়তায়, ভারতীয় জেনারেল উবানের তত্ত্বাবধানে দেরাদুনে তাদের প্রশিক্ষণ। নামেই বোঝা যায় আনুগত্য কার প্রতি। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের সঙ্গে এই বাহিনীর নেতাদের বিরোধ সেই সময়েই প্রকাশ্য। যুদ্ধের ভেতরেই একটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সশস্ত্র আনুগত্যের বীজ বোনা হলো, যার ফসল উঠবে বাহাত্তরে।
ফিরে এসে প্রথম কাজ: যোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়া
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। তিনি ফিরলেন এক নতুন দেশে, যে দেশ তাঁর অনুপস্থিতিতে জন্ম নিয়েছে। লাখো মানুষ তাঁকে দেখতে এসেছিল। ইতিহাস তাঁকে এমন এক সুযোগ দিল, যা খুব কম নেতা পান: একটা গোটা জাতির প্রশ্নহীন আস্থা।
সেই আস্থা দিয়ে তিনি প্রথমে যা করলেন, তা হলো যুদ্ধের কাঠামোটাকে নিজের আনুগত্যের কাঠামোতে বদলে ফেলা। তাজউদ্দীনের গড়া মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা পাশে সরিয়ে, মুজিব বাহিনীর অনুগত অংশ দিয়ে গড়লেন জাতীয় রক্ষীবাহিনী। প্রশিক্ষক আবারও সেই ভারতীয় জেনারেল উবান। যে মুক্তিযোদ্ধারা দলের বাইরের, যারা স্বাধীন মত রাখতেন, তাদের জন্য নতুন রাষ্ট্রে জায়গা কমতে লাগল।
আর যে মানুষটি নয় মাস ধরে যুদ্ধটা কাঁধে নিয়ে চালিয়েছিলেন? তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে অর্থমন্ত্রী হলেন। দুই বছরের মাথায় মুজিব তাঁকে পদত্যাগ করতে বললেন, সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন পদত্যাগপত্রের খসড়াও। তাজউদ্দীন সেই খসড়ায় সই করে বিদায় নিলেন। যিনি পঁচিশে মার্চ রাতে স্বাধীনতার খসড়ায় সই করেননি, তিনি যুদ্ধজয়ী প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের খসড়া পাঠালেন। এই দুটো খসড়ার মাঝখানেই গোটা গল্পটা লুকিয়ে আছে।
সন্ত্রাসের আশ্রয়দাতা
রক্ষীবাহিনী রাষ্ট্রপতির আদেশে জন্ম নিল ১৯৭২ সালের ৮ মার্চ। কাগজে এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বাস্তবে এটা ছিল এক মানুষের প্রতি অনুগত একটা সশস্ত্র দল, প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বাইরে, আর তার নিশানা ছিল সরকারের রাজনৈতিক বিরোধীরা, বিশেষ করে জাসদের তরুণেরা, যাদের অনেকেই কদিন আগে মুক্তিযুদ্ধ করে এসেছে।
খবরের কাগজে যখন তাদের বাড়াবাড়ির খবর নিয়মিত হয়ে উঠল, তখন সরকার বাহিনীকে লাগাম দিল না, দিল বর্ম। ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করে বাহিনীর আগের সব কাজকে ভূতাপেক্ষ বৈধতা দেওয়া হলো, আর বলা হলো, "সরল বিশ্বাসে" করা কোনো কাজের জন্য কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা চলবে না। এ দেশে দায়মুক্তির রাজনীতি এখান থেকেই আইনি চেহারা পেল।
হিসাবটা ভয়াবহ। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের হিসাবে ১৯৭৩ সালের শেষ নাগাদ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দুই হাজার ছাড়িয়েছিল। তিন বছরে রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহতের সংখ্যা নিয়ে নানা হিসাব আছে: কোনো সাংবাদিকের মতে দশ থেকে ত্রিশ হাজার, জাসদের দাবি আরও বেশি। সংখ্যা নিয়ে তর্ক আছে, কিন্তু তর্কটা হাজারের ঘরে, দশকের ঘরে নয়।
১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ। পল্টনে জাসদের সমাবেশ শেষে মিছিল গেল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করতে। ইটপাটকেল, কাঁদানে গ্যাস, তারপর ট্রাকে করে এল রক্ষীবাহিনী, আর চলল তাজা গুলি। আওয়ামী লীগের হিসাবে নিহত ছয় জন, অন্য হিসাবে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ। স্বাধীন দেশের রাজধানীতে, মুক্তিযুদ্ধের তিন বছরের মাথায়, মিছিলের ওপর গুলি।
তারপর সিরাজ সিকদার। প্রকৌশলী, বামপন্থী বিপ্লবী, একাত্তরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে নেমেছিলেন। স্বাধীনতার পর মুজিব সরকারের সশস্ত্র বিরোধী। অপরাধী হলে তাঁর জায়গা ছিল আদালতের কাঠগড়া। ১৯৭৫ সালের শুরুতে চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার, বিমানে ঢাকায় আনা, তারপর ২ জানুয়ারি রাতে সাভারের রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পে নেওয়ার পথে "পুলিশের গুলিতে" নিহত। কিছুদিন পর সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব বলেছিলেন বলে বহুলভাবে উদ্ধৃত: "কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?"
একটা হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে তদন্তের কথা নেই, আছে উল্লাস। পরের পঞ্চাশ বছরে "ক্রসফায়ার", "বন্দুকযুদ্ধ", "আয়নাঘর" নামে এ দেশ যা যা দেখেছে, তার প্রথম খসড়া লেখা হয়েছিল সাভারের সেই রাস্তায়।
আশ্রয়ের গল্পটা শুধু রক্ষীবাহিনীতে শেষ হয় না। ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের নেতা গাজী গোলাম মোস্তফার নাম সে সময়েই দুর্নীতি আর পেশিশক্তির সমার্থক হয়ে উঠেছিল। ১৯৭৪ সালে ঢাকা লেডিস ক্লাবে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে বচসার পর তাঁর লোকজন মুক্তিযোদ্ধা মেজর ডালিম আর তাঁর স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যায়। শেষে মুজিবের বাড়িতে বিষয়টার "আপোষ" হলো, মোস্তফা ক্ষমা চাইলেন। কিন্তু এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় যে সেনা কর্মকর্তারা মোস্তফার বাড়িতে চড়াও হলেন, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে চাকরি গেল তাঁদের। ডালিমের, নূরের, আরও কয়েকজনের। গাজী গোলাম মোস্তফা রইলেন তাঁর জায়গায়। কে আশ্রয় পেল, কে শাস্তি, এই একটা ঘটনাই তার সবচেয়ে সোজা দলিল।
বিশ্ববিদ্যালয়েও ছবিটা আলাদা নয়। ১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনের রাতে গণনার সময় অস্ত্রধারীরা হলে হলে ঢুকে ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিল, সারা রাত গুলি। ভোট গণনা আর হলো না। তার আগে মার্চের জাতীয় নির্বাচনেও কয়েকটি আসনে বিরোধী প্রার্থী এগিয়ে থাকার সময় গণনা থামিয়ে, বাক্স ভরিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণার অভিযোগ উঠেছিল। স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনেই।
একজন সরকারপ্রধানের অপরাধ শুধু নিজে যা করেন তা নয়, যাদের তিনি বাঁচিয়ে রাখেন তাও। শেখ মুজিব বাঁচিয়ে রেখেছিলেন বাহিনীকে, দলের পেশিশক্তিকে, নিজের লোককে। সেই অর্থে তিনি ছিলেন সন্ত্রাসের আশ্রয়দাতা, আর একটা বেপরোয়া রাষ্ট্রের প্রধান।
চুয়াত্তর: চোরের খনির মালিক
১৯৭৪ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর। রংপুর আর উত্তরের জেলাগুলো থেকে প্রথম খবর, তারপর বন্যা, তারপর শহরের রাস্তায় হাড়্ডিসার মানুষ আর লঙ্গরখানার লাইন। সরকারি হিসাবে মৃত্যু সাতাশ হাজার। স্বাধীন গবেষকদের হিসাবে প্রায় পনেরো লাখ, তখনকার জনসংখ্যার প্রায় দুই শতাংশ। যে সরকার নিজের মানুষের মৃত্যুও পঞ্চাশ গুণ কমিয়ে গোনে, সে সরকার মৃত্যু ঠেকাতে কতটা আন্তরিক ছিল, সেই প্রশ্ন উঠবেই।
অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, সেই বছর খাদ্যের মোট জোগান আগের বছরগুলোর চেয়ে খারাপ ছিল না। মানুষ মরেছিল বণ্টনের ব্যর্থতায়, মজুতদারিতে, সীমান্ত দিয়ে চাল পাচারে। রিলিফের কম্বল আর গম গিয়েছিল ভুল হাতে। সেই হাতগুলো কার, মুজিব নিজেই জানতেন। নানা সভায় তিনি আক্ষেপ করেছিলেন বলে প্রবাদের মতো চালু: সবাই পায় সোনার খনি, তিনি পেয়েছেন চোরের খনি; ভিক্ষা করে আনা সাহায্য খেয়ে ফেলে চাটার দল।
কিন্তু খনিটা কার? চোরেরা অচেনা কেউ ছিল না। তারা তাঁর দলের নেতা, তাঁর সুপারিশে বসানো কর্মকর্তা, তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট ঠিকাদার আর লাইসেন্সধারী। যে মানুষের হাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা, তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে চোরদের গালি দেন অথচ চোরের বিচার হয় না, তখন সেই গালি আর ক্ষোভ থাকে না, হয়ে যায় অভিনয়। রক্ষীবাহিনী সিরাজ সিকদারকে খুঁজে বের করতে পেরেছিল। রিলিফের গম কোন গুদামে গেল, সেটা খুঁজে বের করতে পারেনি। কারণ খোঁজার ইচ্ছাটাই ছিল না।
যে সংবিধান তিনি দিলেন, সেটাই তিনি কবর দিলেন
১৯৭২ সালের নভেম্বরের সংবিধান কাগজে ভালো ছিল। সংসদীয় গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা। দুই বছরও টিকল না।
১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর জরুরি অবস্থা, মৌলিক অধিকার স্থগিত। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনী। সংসদীয় ব্যবস্থার জায়গায় রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা, আর শেখ মুজিব কোনো নির্বাচন ছাড়াই রাষ্ট্রপতি। ২৪ ফেব্রুয়ারি বাকশাল, চেয়ারম্যান তিনি নিজে। অন্য সব দল নিষিদ্ধ। সংসদ সদস্যরা জাতীয় দলে না এলে আসন হারাবেন। সরকারি কর্মচারী, পেশাজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের ওপর চাপ দলে নাম লেখানোর। ১৬ জুন সংবাদপত্র অধ্যাদেশ: সরকারি ব্যবস্থাপনায় চারটি কাগজ, বাকি সব বন্ধ। হাজার হাজার সংবাদকর্মী এক দিনে বেকার।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মূল্যায়নে, মুজিব চেয়েছিলেন একদলীয় সরকার আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, আর কোনো সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না।
এখানে একটা হিসাব মিলিয়ে দেখা দরকার। সত্তরের ভোটের রায় পাকিস্তানি শাসকেরা মানেনি বলেই একাত্তর। অর্থাৎ যে যুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি ছিল "মানুষের রায় মানতে হবে", সেই যুদ্ধের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতায় বসা মানুষটিই চার বছরের মাথায় এমন ব্যবস্থা করলেন, যেখানে মানুষের রায় দিয়ে তাঁকে সরানোর আর কোনো রাস্তা রইল না। আইয়ুব খান যা করেছিলেন উর্দি পরে, মুজিব তা করলেন সংসদের সর্বসম্মত ভোটে। পার্থক্যটা পোশাকে, মালে নয়।
খুনিদের ছেড়ে দেওয়া, নদী বন্ধক রাখা
যুদ্ধের পর ভারতের হাতে বন্দী পাকিস্তানি সেনাদের মধ্য থেকে ১৯৫ জন কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধের প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে তাদের বিচারের জন্য আইনও হলো। তারপর ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের স্বীকৃতি, মুজিব উড়ে গেলেন লাহোরের ইসলামি সম্মেলনে, একাত্তরের অন্যতম কুশীলব জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে এক মঞ্চে। ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি। চুক্তির ভাষাতেই স্বীকার করা হলো এই ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে গণহত্যা আর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আছে, আর সেই চুক্তিতেই তাদের বাড়ি ফেরার রাস্তা খুলে দেওয়া হলো। পাকিস্তান নিজে বিচার করবে, এমন একটা মৌখিক প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যায়, যা কাগজে ওঠেনি আর কোনোদিন রক্ষিত হয়নি।
ঘরের দালালদের প্রশ্নেও একই গল্প। ১৯৭২ সালে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদেশ, আর ১৯৭৩ সালের শেষে সাধারণ ক্ষমা। খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে নেই, তারা ছাড়া পেল। হাজার হাজার মানুষ। যে শহীদদের নাম নিয়ে তাঁর সরকার বৈধতা দাবি করত, সেই শহীদদের খুনের প্রধান আসামিরা তাঁর সই করা চুক্তিতে নিরাপদে ফিরে গেল। আর একাত্তরে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়া সিরাজ সিকদার ফিরলেন লাশ হয়ে। এই দুটো ছবি পাশাপাশি রাখলে আর কোনো ব্যাখ্যা লাগে না।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও একই প্রবণতা: দেওয়ার বেলায় ত্রুটি নেই, আদায়ের বেলায় নীরবতা। ১৯৭২ সালের মার্চে পঁচিশ বছরের মৈত্রী চুক্তি। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে স্থল সীমান্ত চুক্তি: দক্ষিণ বেরুবাড়ির অংশ ভারত রাখবে, বাংলাদেশ পাবে তিনবিঘা করিডর। বাংলাদেশ ২৮ নভেম্বরের মধ্যেই তৃতীয় সংশোধনী দিয়ে চুক্তি অনুমোদন করল। ভারত করল না। তিনবিঘার জন্য অপেক্ষা প্রায় দুই দশক, পুরো চুক্তি বাস্তবায়নে চার দশক।
ফারাক্কার গল্প আরও সোজা। ১৯৭৪ সালের যৌথ ঘোষণায় বলা হলো, পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে বাঁধ চলবে না। চুক্তি হলো না, কিন্তু ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে মুজিব সরকার "পরীক্ষামূলকভাবে" ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত একচল্লিশ দিন ফিডার ক্যানাল চালানোর অনুমতি দিল। পরীক্ষা আর শেষ হয়নি। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি নামল, পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা ঢুকল। যে দরজা দিয়ে পদ্মার পানি চলে গেল, সেটা খোলা হয়েছিল তাঁর সইয়ে।
চেতনার প্রথম গাদ্দার
এবার ফিরে যাওয়া যাক সেই তিনটি শব্দে, যা ১০ এপ্রিল ১৯৭১-এর ঘোষণাপত্রে লেখা আছে।
সাম্য। স্বাধীন দেশে সমান হওয়ার কথা ছিল সবার। অথচ মুজিবের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হয়ে দাঁড়াল দলের কার্ড আর তাঁর প্রতি আনুগত্য। রক্ষীবাহিনীতে জায়গা পেল মুজিব বাহিনীর অনুগতরা, রিলিফ গেল দলীয় গুদামে, আর শেষে দেশটাই পরিণত হলো এক দলের সম্পত্তিতে।
মানবিক মর্যাদা। সাভারের রাস্তায় হেফাজতে খুন, রমনায় মিছিলের ওপর গুলি, রক্ষীবাহিনীর দায়মুক্তি, লেডিস ক্লাব থেকে এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়া নেতার নিরাপদ পদ। মর্যাদা পেয়েছিল শুধু ক্ষমতার কাছাকাছি মানুষ।
সামাজিক সুবিচার। পনেরো লাখ মানুষ না খেয়ে মরল, আর যারা গম গিলেছিল তারা রইল দলের ভেতরে। গণহত্যার প্রধান আসামিরা বাড়ি ফিরল, আর ভিন্নমতের মানুষ গেল কবরে।
তিনটি অঙ্গীকারই ভাঙা হয়েছিল স্বাধীনতার প্রথম সাড়ে তিন বছরেই, আর ভাঙা হয়েছিল যাঁর হাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ছিল, তাঁর অধীনে। এখানে কোনো রাজাকারকে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই, সিআইএকেও নয়। রাজাকার গাদ্দারি করেছিল বাইরে থেকে, শত্রুর পক্ষ নিয়ে। শেখ মুজিব করলেন ভেতর থেকে, চেতনার নাম নিয়ে। প্রথমটা চেনা সহজ, দ্বিতীয়টা কঠিন, কারণ সে নিজেই চেতনার মালিকানা দাবি করে। সেই অর্থে তিনিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রথম গাদ্দার।
ইতিহাসের একটা নিষ্ঠুর সমতাও আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। অভ্যুত্থানের সামনে ছিলেন সেই ডালিম, যাঁকে গাজী গোলাম মোস্তফার ঘটনার পর চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তারপর খন্দকার মোশতাক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করলেন, খুনিদের বিচার আটকে দিলেন। রক্ষীবাহিনীর জন্য যে দায়মুক্তির রাস্তা মুজিব সরকার খুলেছিল, সেই রাস্তা দিয়েই হেঁটে গেল তাঁর ঘাতকেরা। এই হত্যাকাণ্ডও অপরাধ, এবং তার বিচার হওয়াই ছিল ন্যায়। কিন্তু শিকার হওয়া মানে নির্দোষ হওয়া নয়। নির্মম মৃত্যু তাঁর শাসনামলের দায় মুছে দেয় না।
আর দায়টা তাঁর মৃত্যুতে শেষও হয়নি। চার দশক পর তাঁর নাম, তাঁর ছবি, তাঁর ভাষণ হয়ে উঠল আরেকটা দীর্ঘ শাসনের বৈধতার উৎস। গুম, ক্রসফায়ার, রাতের ভোট, গণমাধ্যমের ওপর চাপ, সবকিছুর ওপর টাঙানো ছিল একই মানুষের প্রতিকৃতি। ২০২৬ সালে সরকারি বার্তা সংস্থাও যখন সিরাজ সিকদার থেকে আয়নাঘর পর্যন্ত একটা সরলরেখা টানে, তখন বোঝা যায়, গাদ্দারিটা এক প্রজন্মে থামেনি, উত্তরাধিকার হয়ে গেছে।
রায়
পঁচিশে মার্চের সেই রাতে ফিরে যাই। একজন মানুষ টেপ রেকর্ডার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, আরেকজন চুপ করে আছেন। প্রথমজন যুদ্ধটা চালিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর পেলেন পদত্যাগের খসড়া। দ্বিতীয়জন যুদ্ধে ছিলেন না, স্বাধীনতার পর পেলেন পুরো দেশ।
বাকিটা সেই দেশ নিয়ে তিনি কী করলেন, তার হিসাব। সেই হিসাব ওপরে রইল। রায় পাঠকের।
তথ্যসূত্র
- Wikipedia, "Proclamation of Bangladeshi Independence" (২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দীনের খসড়া ও রেকর্ডিং)
- The Daily Star, "The Liberation War and the Provisional Government"
- The Daily Star, তাজউদ্দীনের পদত্যাগপত্রের খসড়া
- Prothom Alo English, "Tajuddin's journey during 1971"
- The Financial Express, "Irrefutable facts" (আর্চার ব্লাড প্রসঙ্গ)"
- Wikipedia, "Mujib Bahini"
- Wikipedia, "Jatiya Rakkhi Bahini"
- Banglapedia, "Raksi Bahini"
- Wikipedia, "1974 Ramna massacre"
- Wikipedia, "1972–1975 Bangladesh insurgency"
- Wikipedia, "Criticism of the Awami League" (মাসকারেনহাসের হিসাব)
- Banglapedia, "Sikder Siraj"
- Wikipedia, "Siraj Sikder"
- Wikipedia, "Gazi Golam Mostafa"
- The Daily Star, "Shahriar's confession"
- Prothom Alo English, "DUCSU election in which ballot boxes were snatched"
- Wikipedia, "1973 Bangladeshi general election"
- Wikipedia, "Bangladesh famine of 1974"
- Banglapedia, "Bangladesh Krishak Sramik Awami League"
- The Daily Star, মহিউদ্দিন আহমদের সাক্ষাৎকার
- BSS, ১৬ জুন সংবাদপত্র বন্ধের দিন
- Wikipedia, "Delhi Agreement"
- Dhaka Tribune, "Revisiting the 1974 tripartite agreement"
- The Daily Star (২০০৬), স্থল সীমান্ত চুক্তি
- Banglapedia, "Farakka Barrage"
- BSS, "Siraj Sikder to Aynaghar"





মন্তব্য
মন্তব্য
চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।
আলোচনায় যোগ দিন
মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।
এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।