সংবিধান নিয়ে আলোচনায় "সংশোধন" ও "সংস্কার" শব্দ দুটি প্রায়ই একটির জায়গায় আরেকটি বসে যায়। অথচ দুটি এক জিনিস নয়। সংশোধন একটি আইনি পদ্ধতি, যার নিয়ম সংবিধানেই লেখা আছে। সংস্কার একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য, যা নানা পথে অর্জিত হতে পারে এবং সংশোধন তার একটি পথ মাত্র।
পার্থক্যটি নিছক পরিভাষার নয়। পরিবর্তন কে আনবে, কতদূর আনতে পারবে, জনগণের সম্মতি কীভাবে নেওয়া হবে এবং আদালত তা পর্যালোচনা করতে পারবে কি না, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বদলে যায় আমরা কোন শব্দটি বেছে নিচ্ছি তার ওপর।
এই লেখায় দুটি ধারণার সংজ্ঞা, আইনি ভিত্তি ও সীমা আলোচনা করা হয়েছে, এরপর বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে ধারণা দুটির প্রয়োগ দেখানো হয়েছে। উদ্দেশ্য কোনো অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দেওয়া নয়, বিষয়টি বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তুলে ধরা।
সংবিধান সংশোধন (Amendment)
সংবিধান সংশোধন বলতে বোঝায় সংবিধানে নির্ধারিত পদ্ধতি মেনে তার কোনো বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিত করা। পরিবর্তনটি ঘটে বিদ্যমান সংবিধানের ভেতর থেকে। সংবিধান বহাল থাকে, বদলায় তার নির্দিষ্ট অংশ।
বাংলাদেশে সংশোধনের পদ্ধতি
বাংলাদেশের সংবিধানের দশম ভাগে একটিই অনুচ্ছেদ আছে, ১৪২, এবং সেটিই সংশোধনের ক্ষমতা ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে। পদ্ধতিটি তিন ধাপের:
- সংসদে একটি বিল উত্থাপিত হয়। বিলের পূর্ণ শিরোনামে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হয় যে এটি সংবিধানের কোনো বিধান সংশোধন করবে।
- বিলটি সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গৃহীত হতে হয়। হিসাব হয় মোট সদস্যের ভিত্তিতে, উপস্থিত সদস্যের ভিত্তিতে নয়।
- গৃহীত বিল রাষ্ট্রপতির কাছে যায়। তিনি সাত দিনের মধ্যে সম্মতি দেন। না দিলে ওই মেয়াদ শেষে সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হয়।
৩৫০ সদস্যের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ মানে অন্তত ২৩৪ জনের সমর্থন।
গণভোটের বিধান
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ১৪২ অনুচ্ছেদে একটি বাড়তি শর্ত যুক্ত হয়: সংবিধানের কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশ সংশোধন করতে হলে সংসদে পাসের পর বিলটি গণভোটে পাঠাতে হবে। দ্বাদশ সংশোধনীর পর বিধানটি যে রূপ নেয়, তাতে নিচের অংশগুলো এই সুরক্ষার আওতায় ছিল।
| সংবিধানের অংশ | বিষয়বস্তু |
|---|---|
| প্রস্তাবনা | সংবিধানের মুখবন্ধ। রাষ্ট্র কোন প্রেক্ষাপটে ও কোন আদর্শে গঠিত, তার ঘোষণা। |
| অনুচ্ছেদ ৮ | রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। আইন প্রণয়ন ও সংবিধানের ব্যাখ্যায় এই নীতিগুলো দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। |
| অনুচ্ছেদ ৪৮ | রাষ্ট্রপতির পদ। তাঁর নির্বাচন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মর্যাদা এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করার বাধ্যবাধকতা। |
| অনুচ্ছেদ ৫৬ | মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী ও অন্য মন্ত্রীদের নিয়োগ এবং মন্ত্রিসভার গঠন। |
| অনুচ্ছেদ ১৪২ | সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা ও পদ্ধতি। অর্থাৎ সংশোধনের নিয়মটিও এই সুরক্ষার ভেতরে ছিল। |
তালিকাটির যুক্তি স্পষ্ট। রাষ্ট্রের আদর্শ, রাষ্ট্রপ্রধানের পদ, সরকারের কাঠামো এবং সংশোধনের নিয়ম, এই কয়টি বিষয়ে পরিবর্তনের জন্য সংসদের পাশাপাশি জনগণের সরাসরি সম্মতি আবশ্যক করা হয়েছিল।
২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনী গণভোটের বিধানটি বিলুপ্ত করে। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি অংশ অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বিধানটি পুনর্বহালের রায় দেন। ২০২৬ সালের ৯ জুলাই আপিল বিভাগ সেই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করেন। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে বিধানটির প্রয়োগের পরিধি আরও স্পষ্ট হবে।
সংশোধনের চারটি বৈশিষ্ট্য
- সুনির্দিষ্ট: প্রতিটি বিল চিহ্নিত অনুচ্ছেদ বা দফা ধরে পরিবর্তন আনে।
- প্রাতিষ্ঠানিক: সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচিত সংসদ, পূর্বনির্ধারিত নিয়মে।
- ধারাবাহিক: সংবিধানের আইনি ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকে।
- পর্যালোচনাযোগ্য: সংশোধনীর বৈধতা আদালতে পরীক্ষিত হতে পারে।
সংবিধান সংস্কার (Reform)
সংবিধান সংস্কার বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো, নীতি বা ক্ষমতার বিন্যাসে বড় ও পরিকল্পিত পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া। এটি কোনো একক আইনি পদ্ধতির নাম নয়। বাংলাদেশের সংবিধানে "সংস্কার" শিরোনামে আলাদা কোনো পদ্ধতি নেই। পরিবর্তনের যে পথ সংবিধান নিজে স্বীকার করে, তা ১৪২ অনুচ্ছেদের সংশোধন।
সংস্কারের প্রশ্নগুলো তাই ভিন্ন মাপের। নির্বাহী ক্ষমতা কার হাতে কতটা থাকবে, আইনসভা এক কক্ষের হবে নাকি দুই কক্ষের, নির্বাচনকালে কোন ধরনের সরকার থাকবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত হবে, রাষ্ট্রের মূলনীতি কী হবে।
সংস্কারের সম্ভাব্য পথ
বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় সংস্কার বাস্তবায়নের চারটি পথ দেখা যায়:
- সংশোধনীর মাধ্যমে: বিদ্যমান আইনসভা নিয়মিত পদ্ধতিতে এক বা একাধিক বড় সংশোধনী পাস করে।
- গণভোটের মাধ্যমে: মৌলিক প্রস্তাবে জনগণের সরাসরি সম্মতি নেওয়া হয়।
- গণপরিষদ বা বিশেষ পরিষদের মাধ্যমে: সংবিধান প্রণয়ন বা ব্যাপক পরিবর্তনের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা কাজটি করে।
- নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে: পুরোনো সংবিধান সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপিত হয়।
বাস্তবে এই পথগুলো প্রায়ই একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়।
সংস্কারের চারটি বৈশিষ্ট্য
- ব্যাপক: লক্ষ্য একটি অনুচ্ছেদ নয়, পুরো ব্যবস্থার নকশা।
- ঐকমত্যনির্ভর: রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা, কমিশন, সংলাপ ও জনমত এখানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে।
- প্রেক্ষাপটনির্ভর: সাধারণত গণঅভ্যুত্থান, শাসনব্যবস্থার সংকট বা বড় রাজনৈতিক পালাবদলের পর এ ধরনের উদ্যোগ দেখা দেয়।
- বৈধতার প্রশ্নে সংবেদনশীল: পরিবর্তনের ক্ষমতা বিদ্যমান সংবিধান থেকে আসছে, নাকি সরাসরি জনগণের অভিপ্রায় থেকে, এই প্রশ্ন প্রায় সব ক্ষেত্রেই ওঠে।
গঠনকারী ক্ষমতা ও সংশোধনী ক্ষমতা
সাংবিধানিক তত্ত্ব দুটি ক্ষমতাকে আলাদা করে দেখে। গঠনকারী ক্ষমতা (constituent power) হলো সংবিধান প্রণয়নের আদি ক্ষমতা, যার অধিকারী জনগণ। সংশোধনী ক্ষমতা (amending power) হলো সংবিধান থেকে প্রাপ্ত একটি সীমিত ক্ষমতা, যা আইনসভা প্রয়োগ করে।
সংশোধন সব সময় দ্বিতীয় ক্ষমতার প্রয়োগ। সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, পরিবর্তনের গভীরতা এমন কি না যে তার জন্য প্রথম ক্ষমতার প্রয়োগ প্রয়োজন। এ প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই, এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও এ নিয়ে মতভেদ আছে।
এক নজরে পার্থক্য
সংক্ষেপে, সংশোধন একটি পদ্ধতি এবং সংস্কার একটি উদ্দেশ্য। নিচে আটটি মানদণ্ডে দুটির তুলনা দেওয়া হলো।
| সংবিধান সংশোধন | সংবিধান সংস্কার |
|---|---|
| প্রকৃতি: আইনগত ও পদ্ধতিগত | প্রকৃতি: রাজনৈতিক ও নীতিগত |
| পরিসর: নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ বা দফা | পরিসর: কাঠামো, নীতি ও ক্ষমতার বিন্যাস |
| আইনি ভিত্তি: ১৪২ অনুচ্ছেদ, যা সংশোধনের ক্ষমতা ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে | আইনি ভিত্তি: সংবিধানে স্বতন্ত্র কোনো পদ্ধতি নেই |
| কর্তৃপক্ষ: সংসদ | কর্তৃপক্ষ: সংসদ, গণভোট, গণপরিষদ বা এদের সমন্বয় |
| প্রয়োজনীয় সমর্থন: মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ | প্রয়োজনীয় সমর্থন: বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য ও জনসম্মতি |
| ক্ষমতার উৎস: সংশোধনী ক্ষমতা, যা সংবিধানপ্রদত্ত | ক্ষমতার উৎস: ক্ষেত্রবিশেষে গঠনকারী ক্ষমতার দাবি |
| ফলাফল: বিদ্যমান সংবিধানের আংশিক পরিবর্তন | ফলাফল: ব্যাপক পরিবর্তন, কখনো নতুন সংবিধান |
| প্রেক্ষাপট: নিয়মিত শাসনকাজ | প্রেক্ষাপট: বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন বা জনআন্দোলন |
দুটি বিষয় এখানে লক্ষণীয়। প্রথমত, ধারণা দুটি পরস্পরবিরোধী নয়। সংস্কার প্রায়ই সংশোধনীর মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি সংশোধনী সংস্কার নয়। কোনো অনুচ্ছেদের ভাষা পরিমার্জন সংশোধন, সংস্কার নয়। আবার একটিমাত্র সংশোধনীও সংস্কার হয়ে উঠতে পারে, যদি তা শাসনব্যবস্থার ধরনই বদলে দেয়।
সংশোধনের সীমা: মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব
দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন থাকলেও সংসদ সংবিধানের সবকিছু বদলাতে পারে না। আইনি দিক থেকে সংশোধন ও সংস্কারের পার্থক্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এই সীমার কারণে।
মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব (basic structure doctrine) অনুযায়ী সংবিধানের কিছু বৈশিষ্ট্য তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জনগণের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সাধারণত এই তালিকায় পড়ে। তত্ত্বটির মূল কথা হলো, সংশোধনের ক্ষমতা সংবিধানকে পরিমার্জনের ক্ষমতা, তার পরিচয় বিলোপের ক্ষমতা নয়।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৩ সালে কেশবানন্দ ভারতী মামলায় তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের আপিল বিভাগ ১৯৮৯ সালে অষ্টম সংশোধনী মামলায় (আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ) এটি গ্রহণ করেন এবং ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপনের বিধানটি বাতিল করেন। তত্ত্বটি নিয়ে সমালোচনাও আছে। সমালোচকদের মতে, কোন বৈশিষ্ট্য "মৌলিক" তা নির্ধারণের ভার শেষ পর্যন্ত অনির্বাচিত বিচারকদের হাতে চলে যায়।
আদালতে পর্যালোচিত সংশোধনী
| সংশোধনী ও বিষয় | আদালতের সিদ্ধান্ত |
|---|---|
| পঞ্চম (১৯৭৯): ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের সামরিক শাসনামলের কার্যক্রমের বৈধতা | ২০০৫ সালে হাইকোর্টে অবৈধ; ২০১০ সালে আপিল বিভাগে বহাল |
| সপ্তম (১৯৮৬): ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সালের সামরিক শাসনামলের কার্যক্রমের বৈধতা | ২০১০ সালে হাইকোর্টে অবৈধ; ২০১১ সালে আপিল বিভাগে বহাল |
| অষ্টম (১৯৮৮): ঢাকার বাইরে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বেঞ্চ | ১৯৮৯ সালে আপিল বিভাগে ওই অংশ বাতিল |
| ত্রয়োদশ (১৯৯৬): নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার | ২০১১ সালে আপিল বিভাগে বাতিল; ২০২৫ সালে পুনর্বিবেচনায় সেই রায় বাতিল |
| পঞ্চদশ (২০১১): তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলোপ, গণভোটের বিধান বিলোপ, ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ সংযোজনসহ একাধিক পরিবর্তন | ২০২৪ সালে হাইকোর্টে আংশিক বাতিল; ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আপিল বিভাগে বহাল |
| ষোড়শ (২০১৪): বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে | ২০১৬ সালে হাইকোর্টে বাতিল; ২০১৭ সালে আপিল বিভাগে বহাল |
পঞ্চদশ সংশোধনীতে যুক্ত দুটি অনুচ্ছেদ আলাদা মনোযোগ দাবি করে, কারণ দুটিই সংবিধান পরিবর্তনের সীমা নিয়ে:
- অনুচ্ছেদ ৭ক: শক্তি প্রয়োগ বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় সংবিধান রদ, বাতিল বা স্থগিত করাকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করে এবং এর জন্য সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রাখে।
- অনুচ্ছেদ ৭খ: প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, তৃতীয় ভাগ এবং মৌলিক কাঠামো-সংক্রান্ত অন্যান্য বিধানকে সংশোধনের অযোগ্য ঘোষণা করে। এর ফলে সংবিধানের একটি বড় অংশ ভবিষ্যৎ সংসদের সংশোধনী ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল।
হাইকোর্ট বিভাগ ২০২৪ সালের রায়ে অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেন।
সারণি থেকে একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশে সংশোধনী ক্ষমতা সীমিত বলে বিবেচিত, এবং সেই সীমা নির্ধারণে আদালত সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। এর একটি ব্যবহারিক তাৎপর্য আছে: যে পরিবর্তন মৌলিক কাঠামো স্পর্শ করে, তা কোন পদ্ধতিতে আনা হলো সেই প্রশ্ন আইনি পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা
১৯৭২ সালে গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়ন করে, যা ছিল গঠনকারী ক্ষমতার প্রয়োগ। এরপর ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সংবিধান ১৭ বার সংশোধিত হয়েছে। এই ইতিহাস দেখায়, আনুষ্ঠানিকভাবে সবগুলোই "সংশোধনী" হলেও তাদের পরিসর ও প্রভাব এক মাপের নয়।
তিনটি দৃষ্টান্ত
- চতুর্থ সংশোধনী (১৯৭৫): সংসদীয় পদ্ধতির বদলে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি এবং একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। পদ্ধতির বিচারে এটি সংশোধনী, প্রভাবের বিচারে শাসনব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর।
- দ্বাদশ সংশোধনী (১৯৯১): সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তন করে। সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সমর্থনে বিলটি পাস হয় এবং পরে গণভোটে অনুমোদিত হয়। সংস্কারধর্মী পরিবর্তন সংশোধনীর পথে আসার এটি একটি উদাহরণ।
- সপ্তদশ সংশোধনী (২০১৮): সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বাড়ায়। এটি সীমিত পরিসরের একটি নিয়মিত সংশোধনী।
২০২৪-পরবর্তী সংস্কার উদ্যোগ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর "সংস্কার" শব্দটি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের অক্টোবরে সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফা আলোচনার পর জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ চূড়ান্ত করে। সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব আছে, যার অনেকগুলোতে বিভিন্ন দলের ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) লিপিবদ্ধ।
পরবর্তী ঘটনাক্রম:
- ১৩ নভেম্বর ২০২৫: জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি হয়। আদেশে গণভোট আয়োজন এবং "হ্যাঁ" জয়ী হলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়।
- ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ব্যালটে চারটি বিষয় একত্রে একটি "হ্যাঁ" বা "না" ভোটের জন্য উপস্থাপিত হয়। ভোট পড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ, এবং প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৬১ শতাংশ "হ্যাঁ"-এর পক্ষে যায়।
- ৯ জুলাই ২০২৬: আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। ফলে ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের সিদ্ধান্তও বহাল থাকে।
এই ঘটনাক্রমে সংশোধন ও সংস্কারের পার্থক্যটি তাত্ত্বিক আলোচনা থেকে বাস্তব প্রশ্নে পরিণত হয়েছে: বড় পরিসরের সাংবিধানিক পরিবর্তন কোন পদ্ধতিতে এবং কোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কার্যকর হবে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত
অন্য দেশের অভিজ্ঞতায়ও একই বিভাজন চোখে পড়ে: সীমিত পরিবর্তন আসে সংশোধনীর পথে, আর শাসনব্যবস্থার রূপান্তর সাধারণত বিশেষ কোনো প্রক্রিয়া দাবি করে।
| দেশ | অভিজ্ঞতা |
|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র | ১৭৮৯ সালে কার্যকর হওয়া সংবিধানই বহাল, সংশোধনী হয়েছে ২৭টি। পরিবর্তন এসেছে মূলত সংশোধনী ও আদালতের ব্যাখ্যার পথে। |
| ভারত | ১৯৫০ সাল থেকে শতাধিক সংশোধনী। তবে ১৯৭৩ সালের পর থেকে মৌলিক কাঠামো সংশোধনের বাইরে বলে আদালত-স্বীকৃত। |
| জার্মানি | মৌলিক আইনের ৭৯(৩) অনুচ্ছেদ "চিরস্থায়ী ধারা" নামে পরিচিত। মানবমর্যাদা, গণতান্ত্রিক ও ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামোর মতো নীতি এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েই সংশোধনযোগ্য নয়। |
| ফ্রান্স | ১৯৫৮ সালে গণভোটে নতুন সংবিধান গৃহীত হয় এবং পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের সূচনা ঘটে। সংস্কার এখানে নতুন সংবিধানের রূপ নেয়। |
| দক্ষিণ আফ্রিকা | বর্ণবাদী শাসনের অবসানে প্রথমে অন্তর্বর্তী সংবিধান, পরে ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত সাংবিধানিক পরিষদে চূড়ান্ত সংবিধান গৃহীত হয়। মূলনীতিতে আগাম সমঝোতা ছিল এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি। |
| নেপাল | ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর গণপরিষদের মাধ্যমে ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান জারি হয়। |
| চিলি | ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রণীত দুটি খসড়া সংবিধান গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। ফলে পুরোনো সংবিধানই বহাল আছে। |
দৃষ্টান্তগুলো থেকে একটি অভিন্ন পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। পদ্ধতি যা-ই হোক, সাংবিধানিক পরিবর্তনের স্থায়িত্ব অনেকটাই নির্ভর করেছে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে ঐকমত্য কতটা বিস্তৃত ছিল তার ওপর।
সংশোধন জিজ্ঞাসা করে, কোন বিধান বদলাবে এবং কত ভোটে। সংস্কার জিজ্ঞাসা করে, রাষ্ট্রের কাঠামো কেমন হবে এবং কার সম্মতিতে। প্রথমটি পদ্ধতির প্রশ্ন, দ্বিতীয়টি উদ্দেশ্য ও বৈধতার।
দুটি ধারণাকে এক করে দেখলে আলোচনা দুই দিক থেকে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। সংস্কারকে কেবল সংশোধনী বিলের বিষয় হিসেবে দেখলে জনসম্মতি ও ঐকমত্যের প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়। আবার সংস্কারকে পদ্ধতির ঊর্ধ্বে দেখলে আইনি ভিত্তি ও আদালতের পর্যালোচনার প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়।
যেকোনো প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিবর্তন মূল্যায়নে তিনটি প্রশ্ন তাই কাজে আসে:
- পরিবর্তনটি নির্দিষ্ট বিধানের, নাকি সামগ্রিক কাঠামোর?
- কোন পদ্ধতিতে তা আনা হচ্ছে, এবং সেই পদ্ধতির আইনি ভিত্তি কী?
- জনগণের সম্মতি কোন উপায়ে নেওয়া হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোন পক্ষ সঠিক তা বলে দেয় না। তবে কোন পক্ষ ঠিক কী দাবি করছে এবং মতপার্থক্যটি আসলে কোথায়, তা স্পষ্ট করে।
সূত্র
- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, দশম ভাগ, অনুচ্ছেদ ১৪২ (ইংরেজি পাঠ)
- আপিল খারিজ: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোট পুনর্বহাল, বাসস, ৯ জুলাই ২০২৬
- তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান ফেরার রায় বহাল, প্রথম আলো
- জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ জারি, বাসস
- Bangladesh's Referendum and Reforms, ConstitutionNet, ৪ মার্চ ২০২৬
আরোও পড়ুনঃ





মন্তব্য
মন্তব্য
চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।
আলোচনায় যোগ দিন
মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।
এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।