একটা ফেয়ার ট্রায়াল

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দুর্দশা, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা।

Mahfuzur Rahmanলেখক
Published
Reading time
৫ মিনিটের পাঠ
পাঠসংখ্যা
৫ বার পড়া হয়েছে
একটা ফেয়ার ট্রায়াল আর্টিকেলের কভারফটো। একটি দাড়িপাল্লার ছবি।

বাংলাদেশের ২ টা মূল সমস্যা থাকলে তার একটি হলো দুর্বল ও অকার্যকর বিচারব্যবস্থা যা মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। ফলত বিচারহীনতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জনতার রোষানল বা বিচারবহির্ভূত হ/ত্যার মতো পথ বেছে নেয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়, ইতিহাস মোতাবেক তা কোনো স্থায়ী সমাধান নয় কিন্তু এটি সৃষ্টি করে এক বিচারহীনতার চক্রাকার ক্ষেত্র।

⚖️ বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাস্তবতা:

▪️মামলার নিষ্পত্তি জটিলতা

বর্তমানে দেশের আদালতে ল ব্যাকলগস এ জমে আছে প্রায় ৪৭.৪ লাখ মামলা। এই বিশাল জটের কারণে একটি সাধারণ হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হতে সময় লাগতে পারে ২৫ থেকে ৪৫ বছর পর্যন্ত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অনাস্থা আনবেই।

▪️ কাঠামোগত দুর্বলতা

বিচারক স্বল্পতা (প্রায় ৯৪ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ১ জন বিচারক), দুর্বল অবকাঠামো, সাক্ষী সুরক্ষার অভাবে সাক্ষীরা অনুপস্থিত থাকা, এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দুর্বল সমন্বয় এই জটকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিচার বিভাগের উন্নয়নে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ মুশকিল হয়ে ওঠার সম্ভাবনার কারণেই মূলত এই অবকাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে সরকারিদলগুলো সবসময় ভাবলেশহীন থাকে।

⚖️ দেশে শরীয়া আইনের বাস্তবতা

শুধুমাত্র শরীয়া আইন বলবৎ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। এই ধারণাটি ভুল, কেননা—

▪️দেশের অভিজ্ঞতা

বিশ্বের বহু দেশে শরীয়া আইন থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণ, খুন ও নারী নির্যাতনের হার অনেক বেশি (যেমন কিছু দেশে ধর্ষণের ন্যূনতম সংখ্যা রিপোর্ট হওয়ার কারণ সামাজিক নিষেধাজ্ঞা ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পেতে বাধাগ্রস্ত হওয়া)। আবার, শরীয়াবিহীন আইন থাকা অনেক উন্নত দেশে অপরাধের হার তুলনামূলক কম। এর থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত সংকটটি আইনের নামের চেয়ে বেশি বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা ও প্রয়োগগত বিষয়ের সাথে জড়িত।

▪️শরীয়ার বিচার প্রক্রিয়া

প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, ইসলামী আইন বা শরীয়াহ বিচারব্যবস্থা কোনো অগোছালো ব্যবস্থা নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতো ইমামগণ তাদের নিজস্ব ‘উসুল’ (আইনি তত্ত্ব ও মৌলিক নীতি) তৈরির মাধ্যমে মাসআলা ইস্তেনবাত (সিদ্ধান্ত নির্ণয়) করতেন, যা ছিল একটি যুক্তিনির্ভর ও কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া। কাজিরা (বিচারক) সেই কাঠামো অনুসরণ করেই রায় প্রদান করতেন, যা ছিল মুখস্থ বিচারের সম্পূর্ণ বিপরীত।

▪️গ্রাম্য সালিশ

ইসলাম একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বাধীন ও সুসংহত বিচারিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে, যা আইনের শাসন নিশ্চিত করে। গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে জটিল ফৌজদারি মামলার ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। প্রকৃত বিচার প্রাপ্তির জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আদালত ব্যবস্থার আবশ্যকতা রয়েছে, কারণ সেখানেই কাঠামোগত ও স্বাধীনভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে রায় প্রদান করা হয়।

⚖️ ক্ষুব্ধ জনতার ‘তাৎক্ষণিক বিচার’: বিপত্তি কোথায়?

আমরা যখন রামিসা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার মতো বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করছি, তখন জনতার এই ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ প্রদানের প্রবণতা বোধগম্য হলেও তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। ইতিহাস ও বর্তমানের উদাহরণ বলছে:

▪️সাইকেল অব ইম্পিউনিটি

যখনই নাগরিকরা নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তখন একটি ‘সাইকেল অব ইম্পিউনিটি’ (দণ্ডবিহীনতার দুষ্টচক্র) শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘হারকিউলিস’ পদ্ধতির মাধ্যমে কাজ করে বিচারব্যবস্থাকে শূণ্য করতে পারে। এটি কোনো অপরাধের সমাধান না করে বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও গভীর করে, ব্যক্তি ও দলগত সহিংসতাকে বৈধতা দেয় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি স্থায়ী সংস্কৃতি তৈরি করে। এখানে জাস্টিস ফেয়ার করতে হলে অবশ্যই রামিজা হত্যার দায়ে অভিযুক্তের পক্ষেও কোর্টে আইনজীবী দাঁড়াতে হবে৷ এই বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদের ৭ দিনের বক্তব্যকে ঘিরে তাকে অপরাধীর বর্গে ফেলে দেয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ রেখে একটা রায় ঘোষণা দেয়ার মতো এক্সাম্পল পরবর্তীতে দেশের জনগণের জন্যই অভিশাপ হয়ে দাড়াতে সময় নেবে না।

▪️ভুক্তভোগীর জন্য অনিশ্চয়তা

রামিসা ইস্যুতে রামিসার বাবা তিন জনের নামে মামলা করেন। পুরো মিডিয়া জুড়ে তৃতীয় ব্যক্তির কথা ওয়াইপড আউট৷ সব যায়গায় স্বামী-স্ত্রীকে হাইলাইট করা হচ্ছে। কিন্তু কে ছিলো এই তৃতীয় ব্যক্তি! সোহেলের এই ন্যাক্কারজনক অপরাধের সাথী সম্পর্কে জবানবন্দিতে কিছুই বলে নাই!? তার পরিচয় গোপন করার মাধ্যমে এখানে কাকে বাঁচানো হচ্ছে কেউই জানে না। বিচার বহির্ভূত হত্যা বা জনতার রোষানলে মৃত্যুর ঘটনাগুলো প্রকৃত ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ, এর ফলে আসল অভিযুক্ত অথবা অপরাধের বিষয়বস্তু সম্পর্কে সঠিক অনুসন্ধান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

▪️দেশজুড়ে ব্যাপকতা

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার (Odhikar)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত মোট ২,৬৯৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন এবং ৬৭৭ জন বলপূর্বক গুম হন। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেন ১,০৪৮ জন। আমরা অতীতে দেখেছি আবদুল কাদের মোল্লা রিভিউ আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই কার্যকর করা হয়, তার মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আর আপিলের সুযোগ ছিল না। বর্তমান সরকারকে চাপের মুখে ড্যামেজ কন্ট্রোল করার জন্য সেইম রেফারেন্স বা এক্সাম্পল ক্রিয়েট করতে দিয়ে এই জাতীয় অন্যায়ের সুযোগ দেয়া আবারও দেশকে ধ্বংসের দিকে টানবে।

⚖️ ‘ফেয়ার ট্রায়াল’ নিশ্চিত করাই ন্যায়বিচারের মূল শর্ত

আমরা বলি, “হাসিনা খুনি। গণহত্যাকারী... কিন্তু পরে আমরা আদালতে গেলাম কেন?” – এটাই একটি পরিণত রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি। ইতিহাসের ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধের বিচারও (নুরেমবার্গ ট্রায়াল বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) আসামীপক্ষের জন্য আইনজীবীর ব্যবস্থা করে রেখেছে, বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করতে। বিচার প্রক্রিয়াটি যাতে পুঁজিবাদী বা প্রতিহিংসামূলক না হয় এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, সেজন্য সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া ও ফেয়ার ট্রায়ালের বিকল্প নেই। কাজেই রামিসা বা যেকোনো হত্যা মামলার বিচার দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত করতে চাইলে আমাদের প্রতিদিন সতর্ক থাকতে হবে আইনি পদ্ধতিকে ত্বরান্বিত করার বিষয়ে।

সংক্ষেপে, আমাদের সমস্যার সমাধান কোনো জাদুদণ্ডে নেই; এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট। বিচারব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে ফেলার পেছনে আইনের বইয়ের সীমাবদ্ধতা নয় বরং প্রয়োগ ও কাঠামোর দুর্বলতা বেশি দায়ী। আর এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হলো আইনি প্রক্রিয়ার সুসংহতকরণ ও ত্বরান্বিতকরণ। জনতার রোষানল বা ক্রসফায়ার কোনো পথ নয়, বরং তারা একই দুষ্টচক্রের অংশীদার। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও দক্ষ বিচারব্যবস্থা, যার ওপর নাগরিকরা ভরসা রাখতে পারে। কারণ দুর্বল বিচারব্যবস্থা আর অস্থির আইনশৃঙ্খলার সমীকরণে যে চূড়ান্ত পরিণতি, তার মূল্য দিতে হয় সবচেয়ে বেশি সাধারণ নাগরিকদেরই।


আরোও পড়ুনঃ সংবিধান সংস্কার বনাম সংবিধান সংশোধন: পার্থক্য, প্রক্রিয়া ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

Mahfuzur Rahman

লিখেছেন

Mahfuzur Rahman

লেখক সম্পর্কে আরও →

মন্তব্য

মন্তব্য

চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আলোচনায় যোগ দিন

মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।

এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।

PoliticsEnglish

শেখ মুজিব কেন এই বঙ্গের অপরাধী?

পঁচিশে মার্চের রাতে স্বাধীনতার খসড়ায় সই না করা মানুষটি কীভাবে যুদ্ধের একক মালিক হলেন, আর সাড়ে তিন বছরে সাম্য, মর্যাদা ও সুবিচারের অঙ্গীকার ভাঙলেন।

১৩ মিনিট২
PoliticsEnglish

বাংলা দুনিয়া: পলি, পানি ও উপসাগরের রাজনীতি

বাংলাদেশের আগামীর লড়াই পানি, পলি আর বঙ্গোপসাগরের। ফারাক্কা থেকে মেডগ, গঙ্গা চুক্তি থেকে উপকূলের লবণাক্ততা পর্যন্ত এক বিশ্লেষণ, আর বাংলা সভ্যতা ও বাংলা দুনিয়ার ধারণায় নতুন রাজনীতির প্রস্তাব।

১২ মিনিট৪৩

জিন্নাহ ও রবীন্দ্রনাথ: বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন

জিন্নাহর জন্য মালা, রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি: বাংলাদেশপন্থার নামে চলা দ্বৈত মানদণ্ডের একটি তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ।

১৩ মিনিট১৪