হস্তিনাপুরের রঙ্গভূমিতে সেদিন রাজপুত্রদের অস্ত্রবিদ্যার প্রদর্শনী। অর্জুনের তীর দেখে জনতা যখন মুগ্ধ, তখন ভিড় ঠেলে এক অচেনা যুবক এগিয়ে এল। অর্জুন যা যা দেখিয়েছে, সে একে একে সবই করে দেখাল। তারপর চাইল দ্বন্দ্বযুদ্ধ।
কেউ তার ধনুকের দিকে তাকাল না। কৃপাচার্য উঠে দাঁড়িয়ে কেবল একটি প্রশ্ন করলেন: তোমার পিতা কে, কোন বংশে তোমার জন্ম? যুবকের মাথা নুয়ে এল, বর্ষায় ভেজা পদ্মের মতো। তার নাম কর্ণ। সারথির ঘরে মানুষ হয়েছে বলে তাকে ডাকা হলো সূতপুত্র।
হাজার হাজার বছর কেটে গেছে। রঙ্গভূমি বদলেছে, পোশাক বদলেছে, ভাষা বদলেছে। প্রশ্নটা বদলায়নি। আজও মানুষ কী পারে তা জানার আগে আমরা জানতে চাই, সে কে।
জাহাজের খোলে, গ্রামের শেষ প্রান্তে
প্রশ্নটা কখনো কখনো আইন হয়ে উঠেছে। ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী, প্রায় চারশো বছর ধরে আটলান্টিকের বুক চিরে জাহাজ চলেছে, আর তার অন্ধকার খোলে শেকলে বাঁধা মানুষ। আনুমানিক সোয়া এক কোটি আফ্রিকান। যারা সমুদ্র পেরিয়ে বেঁচে রইল, তাদের সন্তানেরা জন্মাল দাস হয়ে। কোনো অপরাধ করার আগেই দণ্ড লেখা হয়ে গিয়েছিল, মায়ের গর্ভে।
আমাদের এই উপমহাদেশে জাহাজ লাগেনি। গ্রামের ভেতরেই টেনে দেওয়া হয়েছিল অদৃশ্য রেখা। কার হাতে পুঁথি উঠবে, কার হাতে তলোয়ার, আর কে গ্রামের শেষ প্রান্তে থেকে অন্যের ময়লা বইবে, তা ঠিক হয়ে যেত আঁতুড়ঘরে। ভারতের সংবিধান ১৯৫০ সালে অস্পৃশ্যতাকে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু কাগজের আইন যত সহজে বদলায়, মানুষের চোখ তত সহজে বদলায় না।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে গায়ের রং ঠিক করে দিয়েছে কে কোন পাড়ায় থাকবে, কোন বেঞ্চে বসবে, কাকে ভালোবাসার অধিকার পাবে। তিন মহাদেশ, তিন ব্যবস্থা, অথচ ভেতরের কথাটা একই: মানুষের দাম তার কাজে নয়, তার জন্মে। সেই আইনগুলো আজ জাদুঘরে। কথাটা রয়ে গেছে আমাদের ড্রয়িংরুমে।
আয়নার সামনে
একটি মেয়ের কথা ভাবুন। পাত্রপক্ষ আসবে বলে সকাল থেকে বাড়িতে তোড়জোড়। মা এক ফাঁকে এসে মুখে আরেক পরত পাউডার বুলিয়ে দিয়ে যান, নিচু গলায় বলেন, আলোর দিকে মুখ করে বসিস। মেয়েটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। সে জানে, আজ তার ডিগ্রি দেখা হবে পরে, রংটা দেখা হবে আগে।
এই মেয়েটিকে আমরা সবাই চিনি। তবু বর্ণবাদের ইতিহাস শুনলে আমাদের সমাজের গণ্যমান্যরা আহত হন, দূর দেশের অবিচারে ঘৃণা প্রকাশ করেন। অথচ পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনে 'ফর্সা' শব্দটি আজও যোগ্যতার ঘরে বসে থাকে। রং ফর্সা করার ক্রিম এ অঞ্চলে দশকের পর দশক ধরে বিরাট ব্যবসা। সমালোচনার মুখে ইউনিলিভার ২০২০ সালে 'ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি'র নাম বদলে রেখেছে 'গ্লো অ্যান্ড লাভলি'। কৌটার গায়ের নাম বদলেছে, কৌটা কেনার কারণটা বদলায়নি।
দূরের বর্ণবাদকে ঘৃণা করা সহজ, তাতে নিজের কিছু ছাড়তে হয় না। ঘরের বর্ণবাদকে চেনা কঠিন, কারণ সেখানে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকি আমরাই।
রোল কলের পরের প্রশ্ন
এবার একটি শ্রেণিকক্ষ। নতুন বছরের প্রথম দিন, রোল কল শেষ। শিক্ষক চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে একে একে জিজ্ঞেস করছেন, বাবা কী করেন? কেউ বলে ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বলে ব্যাংকার। তৃতীয় বেঞ্চের ছেলেটি একটু থেমে বলে, রিকশা চালান। ক্লাসঘরে কিছুই ঘটে না, কেবল শিক্ষকের চোখ এক মুহূর্ত আগেই পরের জনের দিকে সরে যায়। ওই এক মুহূর্তে ছেলেটি জেনে যায়, এই ঘরে তার জায়গা কোথায়।
ব্রাহ্মণ কিংবা রাজপরিবারের বাইরের কাউকে ঐশ্বর্য বা ক্ষমতার আসনে দেখলে ইতিহাসের বরাবরই গায়ে লেগেছে। রাজা গেছেন, রাজবাড়ি ভেঙে পড়েছে, জ্বালাটা যায়নি। 'ভুঁইফোঁড়', 'নতুন পয়সা', 'খান্দান নেই', শব্দগুলো সেই পুরোনো জ্বালারই নতুন জামা। এ দেশের বহু শিক্ষক আজও ছাত্রের বাবার পেশা জেনে তবে ঠিক করেন, ছেলেটির সঙ্গে সম্পর্কটা কেমন হবে।
শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল সিঁড়ি, যা বেয়ে মানুষ জন্মের ঘর পেরিয়ে যাবে। সিঁড়ির মুখে শিক্ষক নিজেই যখন পাহারায় বসেন, তখন সিঁড়িটা থাকে, ওঠার অনুমতিটা থাকে না।
কাটা আঙুলের দক্ষিণা
সব দেয়াল অবশ্য দরজা বন্ধ করে না। কিছু দেয়াল দরজা খুলে দেয়, ভেতরে ডাকে, পিঠ চাপড়ায়, তারপর দেখিয়ে দেয় কোন চেয়ারটায় বসা যাবে না। প্রতিভাকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেয়ে পোষ মানানো ঢের লাভজনক। শেকলটা তখন লোহার হয় না, হয় প্রশংসার।
নিষাদের ছেলে একলব্যকে দ্রোণাচার্য শিষ্য করেননি। ছেলেটি বনে ফিরে গিয়ে মাটি দিয়ে গুরুর মূর্তি গড়ল, তার সামনে একা একা তীর ছুড়তে শিখল। যেদিন বোঝা গেল সে অর্জুনকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে, সেদিন গুরু এলেন দক্ষিণা নিতে। চাইলেন ডান হাতের বুড়ো আঙুল। যোগ্যতাকে অস্বীকার করা যায়নি, তাই তাকে পঙ্গু করে রাখা হলো।
আঙুল কাটার ধরন এখন বদলেছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর আমরা একটি মধুর আশ্বাস শুনেছিলাম: কৃষক-মজদুরের ছেলে, মাদ্রাসার ছাত্র, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সাত কলেজের শিক্ষার্থী, নেতৃত্বের দরজা সবার জন্য খোলা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতারণামূলক বক্তব্যগুলোর একটি ছিল এটি। রাজপথে ওদের সংখ্যা দরকার ছিল, বুক দরকার ছিল। নেতৃত্ব ভাগের দিনে তালিকাটা ছোট হয়ে এল চেনা কয়েকটি বৃত্তে।
আর এই অবিচারের ওপর পর্দা টেনে রাখে এক বিশেষ জাতের মানুষ, যারা সব আমলেই ক্ষমতার উনুনের পাশে একটু উষ্ণতা খোঁজে। দিনে তারা মজলুমের সারিতে দাঁড়িয়ে গলা ফাটায়, রাতে ক্ষমতাসীনের দরবারে হাজিরা দেয়। মজলুমের মাথা বেচে নিজের আসন কেনার এই বিদ্যা সবার আয়ত্তে আসে না।
এক শহর, দুই মানচিত্র
ঢাকায় একটা প্রশ্ন আছে, যা শুনতে নিরীহ: বাসা কোথায়? উত্তরে গুলশান বা বনানী বললে আলাপ এগোয় চায়ের দিকে। টঙ্গী বা ধোলাইপাড় বললে সামনের মানুষটির ভুরু সামান্য ওঠে, গলার স্বর সামান্য বদলায়। ওই সামান্যটুকুর ভেতরেই একটা আস্ত রায় লেখা হয়ে যায়: লোকটার রুচি কেমন, পড়াশোনা কদ্দূর, তাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া চলে।
একই শহর, অথচ মানচিত্র দুটো। ২০২৬ সালে এসেও সেই দ্বিতীয় মানচিত্রটি কেউ ছিঁড়ে ফেলেনি। বিচারটা চলে নিঃশব্দে, উচ্চারণ শুনে, স্কুলের নাম শুনে, বাসের রুট শুনে। কোথাও লেখা থাকে না, তবু চাকরির ইন্টারভিউ থেকে বিয়ের প্রস্তাব পর্যন্ত সবখানে তার ছায়া পড়ে।
পরিহাস এই যে, ভুরু যাঁরা তোলেন, তাঁদের হাতেই কলম দিয়ে বৈষম্য নিয়ে লিখতে বলুন। যা বেরোবে, তা প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ছাপার যোগ্য। বৈষম্যের তত্ত্ব তাঁদের ঠোঁটস্থ। শুধু আয়নাটা তাঁদের ঘরে নেই।
জুলাইয়ের দুই রাস্তা
চব্বিশের জুলাই। যাত্রাবাড়ীর রাস্তায় একটি ছেলের কথা ধরুন, যার নাম কোনো ব্যানারে নেই। সে কোনো সংগঠনের কেউ নয়, কোনো ক্যামেরা তার দিকে ফেরানো নেই। গুলিটা যখন তার গায়ে লাগে, সেই মুহূর্তের কোনো ছবিও থাকে না।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তাঁদের অনেকে পড়ে গেছেন যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, রামপুরার মতো রাস্তায়, কেন্দ্রীয় মঞ্চ থেকে বহু দূরে।
অথচ স্মৃতি ভাগ হয়ে গেছে রাস্তা ধরে। যে শাহবাগে ছিল, সে গণঅভ্যুত্থানকে শাহবাগের চোখেই দেখতে চায়। যে যাত্রাবাড়ী বা উত্তরায় লড়েছে, সে দেখতে চায় যাত্রাবাড়ী বা উত্তরার চোখে। প্রতিটি রাস্তারই নিজস্ব তাৎপর্য আছে, কোনোটিই কারও চেয়ে খাটো নয়। কিন্তু স্বীকৃতির পাল্লা সমান ঝোলেনি। যাত্রাবাড়ীর সেই গুলিবিদ্ধ ছেলেটির চেয়ে বড় বিপ্লবী বলে পরিচিতি পেয়েছে সে, যার শাহবাগে এক দফার ঘোষক নাহিদ ইসলামের পাশে দাঁড়ানো একটি ছবি আছে।
ত্যাগ এখানে মাপা হয়েছে রক্তে নয়, নৈকট্যে। ইতিহাস এভাবেই হাতছাড়া হয়। যারা লেখে, তারা নিজেদের জানালা থেকেই লেখে। আর যাদের জানালা থেকে কেউ লেখে না, তারা নিজেদের বিপ্লবেই পাদটীকা হয়ে থাকে।
মাটিতে বসে যাওয়া চাকা
রঙ্গভূমির সেই যুবকের কাছে ফেরা যাক। অপমানের পর সে বিদ্যা খুঁজতে গিয়েছিল পরশুরামের কাছে, যিনি ক্ষত্রিয়কে শেখান না। তাই নিজের পরিচয় লুকিয়ে ব্রাহ্মণ সাজতে হয়েছিল তাকে। যেদিন ধরা পড়ল, সেদিন গুরুর কাছ থেকে পেল অভিশাপ: সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে এই বিদ্যা তোমার মনে পড়বে না।
কুরুক্ষেত্রের সতেরোতম দিনে তার রথের চাকা মাটিতে বসে গেল। সে নেমে চাকা তুলছিল, নিরস্ত্র, আর তখনই তীরটা এল। পাণ্ডবেরা সেই যুদ্ধে যা-ই করে থাকুক, মহাকাব্যের পাঠক আজও কর্ণের দোষগুলোই আগে গোনে। কারণ তার অপরাধ তার কাজের বহু আগে ঘটে গিয়েছিল, জন্মের দিনে।
তবু বিজয়কে যতকাল স্মরণ করা হবে, ততকাল কর্ণদেরও স্মরণ করতে হবে। ইতিহাস শুধু বিজয়ীর গল্প নয়। ইতিহাস তাদেরও, যাদের যোগ্যতা পরিচয়ের দেয়ালে আটকে দেওয়া হয়েছিল: আয়নার সামনের সেই মেয়েটির, তৃতীয় বেঞ্চের সেই ছেলেটির, যাত্রাবাড়ীর সেই গুলিবিদ্ধ তরুণের।
স্বগোত্রীয় নয় বলে, একই বর্ণের, একই ধর্মের, একই শ্রেণির কিংবা একই ভূখণ্ডের নয় বলে কাউকে অযোগ্য বা নিকৃষ্ট ভাবা অন্যায়। যে সমাজ ধনুকের আগে বংশ দেখে, সে প্রতিদিন নিজের কর্ণদের হারায়। এবং হারিয়ে টেরও পায় না।
আরোও পড়ুনঃ





মন্তব্য
মন্তব্য
চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।
আলোচনায় যোগ দিন
মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।
এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।