কাঠগড়ায় নজরুল: শ্রেণির চশমায় এক কবির বিচার

কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর মৃত্যুর আগে বা পরেও কেবল অস্তিত্ব রক্ষায় বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানোর কারণ কি কেবলই তাঁর একজন বিখ্যাত কবি হওয়া?

Mahfuzur Rahmanলেখক
Published
Reading time
৯ মিনিটের পাঠ
পাঠসংখ্যা
৬৩ বার পড়া হয়েছে
নির্বাচিত
কাঠগড়ায় কাজী নজরুল ইসলাম: শ্রেণির চশমায় এক কবির বিচার। কাজী নজরুল ইসলামের ছবি সাথে বই ও দাড়িপাল্লা।
এই লেখায়১২টি অংশ
  1. যে প্রশ্নটা কেউ মুখে আনেন না
  2. চুরুলিয়া থেকে 'বিদ্রোহী': বাইশ বছরের পথ
  3. ধার করা প্রতিভার তত্ত্ব
  4. অভিযোগের খাতা, এবং তার উল্টো পাঠ
  5. ভৃগুর দ্বিতীয় আগমন
  6. একই মানুষ, দুই বিপরীত চরিত্র
  7. অণুবীক্ষণের নিচে শুধু একজন
  8. শোক, ধর্ম এবং 'সেক্যুলার' নজরুলের বিচার
  9. শ্রেণির আহত অহম
  10. অস্বীকার করলেই মুছে ফেলা যায় না
  11. শেষ কথা
  12. তথ্যসূত্র

যে প্রশ্নটা কেউ মুখে আনেন না

গরিবের ছেলে কোনোদিন একটা ভালো জামা পরলে লোকে ধরে নেয়, জামাটা চুরির। কাজী নজরুল ইসলাম একটা দেশের জাতীয় কবি, অথচ দারিদ্র্যের পরিচয়টা তাঁর কপালে তিলকের মতো লেগেই রইল। দুই বাংলার নজরুল-চর্চা তাঁকে এই পরিচয় থেকে কখনো ছুটি দেয়নি।

গোলাম মুরশিদ, সৌমিত্র শেখর, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, নির্মলেন্দু ভৌমিকসহ বহু লেখক ও গবেষক নজরুলকে নিয়ে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গেই লিখেছেন। কিন্তু মনোযোগী পাঠক টের পান, সেই শ্রদ্ধার ভেতরে একটা কথা সযত্নে চেপে রাখা আছে। ভদ্রতার খাতিরে কথাটা মুখে আটকায়, তবু লেখার ভাঁজে ভাঁজে বেরিয়ে পড়ে।

চেপে রাখা কথাটা সোজা ভাষায় এই: চুরুলিয়ার এক হতদরিদ্র ঘরের ছেলে 'বিদ্রোহী'র মালমশলা পেল কোথায়?

এই লেখার দাবি হলো, নজরুল-চর্চার একটা বড় অংশ আসলে এই একটি প্রশ্নেরই নানা রকম উত্তর। আর প্রশ্নটা যতটা সাহিত্যের, তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রেণির।

চুরুলিয়া থেকে 'বিদ্রোহী': বাইশ বছরের পথ

নজরুল 'বিদ্রোহী' লেখেন বাইশ বছর বয়সে, এবং তার আগের বাইশ বছরে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যিক পরিবেশ তিনি পাননি। সমালোচকদের অস্বস্তির উৎস এই ফাঁকটাই। তাই আগে পথটা দেখে নেওয়া দরকার।

সময় ঘটনা
১৮৯৯বর্ধমানের আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম। বাবা কাজী ফকির আহমদ মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। ডাকনাম দুখু মিয়া।
১৯০৮বাবার মৃত্যু। সংসারের দায়ে মক্তবে শিক্ষকতা, মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ।
কৈশোরলেটো দলে যোগ, পালা ও গান রচনা। চাচা কাজী বজলে করিম ছিলেন লেটো দলের ওস্তাদ, ফারসি ও উর্দুতে দক্ষ।
১৯১০-এর দশকআসানসোলে রুটির দোকানে কাজ। পরে ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুল এবং রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে পড়াশোনা।
১৯১৭ম্যাট্রিকের আগেই স্কুল ছেড়ে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনে যোগ। করাচি সেনানিবাসে থেকে হাবিলদার পদে উন্নীত, হাফিজসহ ফারসি কাব্যের নিবিড় পাঠ।
১৯২০পল্টন ভেঙে গেলে কলকাতায়। মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে একই ঘরে বাস, 'নবযুগ' পত্রিকায় সাংবাদিকতা।
১৯২১আলী আকবর খানের সঙ্গে কুমিল্লার দৌলতপুরে যাওয়া, নার্গিসের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন ও ভাঙন। ডিসেম্বরে 'বিদ্রোহী' রচনা।
১৯২২জানুয়ারিতে সাপ্তাহিক 'বিজলী'তে 'বিদ্রোহী' প্রকাশ। 'অগ্নিবীণা' ও 'ধূমকেতু' প্রকাশ।
১৯২৩'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতার জন্য রাজদ্রোহের দায়ে এক বছরের কারাদণ্ড, জেলে ৪০ দিনের অনশন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে 'বসন্ত' গীতিনাট্য উৎসর্গ করেন।
১৯৩০বসন্ত রোগে শিশুপুত্র বুলবুলের মৃত্যু (বাংলাপিডিয়ায় সালটি ১৯২৯)।
১৯৪২অসুস্থতায় বাকশক্তি ও লেখার ক্ষমতা হারান।
১৯৭৬ঢাকায় মৃত্যু।

তালিকাটা একটা জিনিস পরিষ্কার করে। মক্তব, লেটোর আসর, রুটির দোকান, ব্যারাক, সংবাদপত্রের টেবিল — নজরুলের শিক্ষা হয়েছে এমন সব জায়গায়, যেগুলোকে বাংলার ভদ্রলোক সমাজ শিক্ষার জায়গা বলে গণ্যই করে না। ফলে তাঁর জ্ঞানের উৎস নিয়ে সন্দেহটা প্রায় আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিল।

ধার করা প্রতিভার তত্ত্ব

সব ব্যাখ্যা একসঙ্গে জুড়লে দেখা যায়, নজরুলের নিজের বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। প্রতিটি তত্ত্ব আলাদাভাবে নিরীহ, এমনকি তথ্যনির্ভর। সমস্যাটা তাদের যোগফলে।

প্রথম ধাক্কাটা যায় 'বিদ্রোহী'র ওপর দিয়েই। বলা হয়েছে, নজরুল কবিতাটা বুঝে লেখেননি। ওয়াল্ট হুইটম্যানের 'সং অব মাইসেলফ', মোহিতলাল মজুমদারের 'আমি' আর রবীন্দ্রনাথের ভাষা ঘুঁটে, ওপরে দু চিমটি ইসলাম ছিটিয়ে তিনি ঝটপট একটা কবিতা পরিবেশন করেছেন। মোহিতলাল নিজেই দাবি তুলেছিলেন যে কবিতাটির ভাব তাঁর গদ্যরচনা থেকে নেওয়া। নিয়াজ জামান অবশ্য দেখিয়েছেন, মোহিতলালের রচনায় নজরুলের কবিতার চিত্রকল্প ও অনুষঙ্গের সেই জটিল বুনন নেই।

এরপর আসে ব্যক্তিজীবন। ১৯৪২ সালে নজরুল বাকশক্তি হারানোর পর তাঁর বন্ধু ও পরিচিতরা একের পর এক তত্ত্ব হাজির করেছেন: কোন মহলের কে তাঁকে কী বুঝিয়েছেন, কে কানে কী মন্ত্র দিয়েছেন, কে কীভাবে প্রভাবিত করেছেন। যিনি আর উত্তর দিতে পারেন না, তাঁর হয়ে সবাই কথা বলেছেন।

ফলাফলটা দাঁড়ায় এ রকম:

নজরুলের যাকৃতিত্ব যাঁকে দেওয়া হয়েছে
দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক চেতনামুজফ্ফর আহমদ
নারীপ্রেমআলী আকবর খান
অন্নসংস্থানগিরিবালা দেবী
উর্দু ও ফারসিচাচা কাজী বজলে করিম
'বিদ্রোহী'র ভাব ও ভঙ্গিহুইটম্যান, মোহিতলাল, রবীন্দ্রনাথ

সবাইকে মেনে নিলে মনে হবে, বাকশক্তি হারানোর অনেক আগে থেকেই নজরুল বোবা ছিলেন। তিনি পুতুল, তিনি বোকা, তিনি নামলোভী। একই সঙ্গে তিনি দাম্ভিক, মুখসর্বস্ব এবং সাম্প্রদায়িক।

লেখার মান নিয়েও রায় আছে। কেউ কেউ বলেছেন, নজরুল মূলত ছড়াকার, সমকালীন সাহিত্যিকদের মাপের গভীরতা তাঁর ছিল না। মুসলমান সমাজে ভালো লেখকের ঘাটতি ছিল বলেই পুরাণ থেকে দু-চারটে উদ্ধৃতি দিতে পারা একজন লোক বন্ধুদের বদান্যতায় বঙ্গীয় 'কালচারে' জায়গা পেয়ে গেছেন।

প্রভাব প্রত্যেক লেখকের ওপরই থাকে। কিন্তু প্রভাবের হিসাব দিয়ে একজন লেখককে পুরোপুরি শূন্য করে ফেলার এই চেষ্টা বাংলা সাহিত্যে আর কারও বেলায় দেখা যায় না। বাংলাপিডিয়ার নজরুল-ভুক্তি বলে উল্টো কথা: পূর্বসূরিদের তিনি শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু কাউকে অনুকরণ করেননি, রবীন্দ্রনাথকেও নয়।

অভিযোগের খাতা, এবং তার উল্টো পাঠ

নজরুলের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলো পাশাপাশি রাখলে একটা ছক ধরা পড়ে: প্রতিটিতেই তাঁর কাছে এমন মান দাবি করা হয়েছে, যা অন্য কোনো কবির কাছে চাওয়া হয় না।

অভিযোগযে প্রশ্নটা ওঠে
আনোয়ার পাশা ও কামাল পাশা দুজনকে নিয়েই কবিতা লিখেছেন, অথচ তাঁরা ছিলেন পরস্পরের প্রতিপক্ষ। অতএব নজরুল তুরস্কের রাজনীতি বুঝতেন না।খিলাফত আন্দোলনের যুগে ঔপনিবেশিক বাংলার এক তরুণের কাছে দুজনই ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। কবিতা দলীয় ইশতেহার নয়। বাংলাপিডিয়ার মতে 'কামাল পাশা' কবিতাটি বরং সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস সম্পর্কে নজরুলের সচেতনতারই প্রমাণ।
'খ্যাপা দুর্বাসা'র নাম নিয়েছেন, কিন্তু দুর্বাসার কোনো অজানা কাহিনি হাজির করেননি। তাই পুরাণের বোধ গাঢ় নয়।পৌরাণিক অনুষঙ্গ ব্যবহার করতে গেলে নতুন তথ্য আবিষ্কার করতে হবে, এই শর্ত আর কোন কবির ওপর চাপানো হয়েছে?
শ্যামাসংগীত উপলব্ধি থেকে আসেনি, এসেছে কালীর কাছে মানত পূরণের পর জন্মানো কুসংস্কার থেকে।একজন শিল্পীর ভক্তিকে লেনদেনে নামিয়ে আনার এই অধিকার সমালোচক কোথায় পেলেন?
নবীকে নিয়ে লেখা গানগুলো রেডিও থেকে পয়সা কামানোর জন্য লেখা।গ্রামোফোন ও বেতারের জন্য গান লেখা ছিল তাঁর জীবিকা। পারিশ্রমিক নিলে রচনা মিথ্যা হয়ে যায় না।
নিজের নাম নিয়ে অহংকার ছিল, পত্রিকায় নামের আগে 'হাবিলদার' লিখে বড়াই করতেন।যাঁর ডিগ্রি নেই, বংশপরিচয় নেই, তাঁর একমাত্র অর্জিত পদবি ওটাই। ডিগ্রি বা খেতাব নামের সঙ্গে জুড়লে সেটা কি বড়াই বলে গণ্য হয়?
রুটির দোকান ছেড়ে স্কুলে গেছেন, কারণ বৃত্তির টাকা মাইনের চেয়ে বেশি। ম্যাট্রিক না দিয়ে পল্টনে গেছেন, কারণ বেতন বৃত্তির চেয়ে দশ টাকা বেশি।গরিবের প্রতিটি সিদ্ধান্তই অর্থনৈতিক। টিকে থাকার হিসাবকে লোভ হিসেবে পড়াটাই শ্রেণির চোখ। অন্য জীবনী-বিবরণে পল্টনে যাওয়ার কারণ হিসেবে আসে অ্যাডভেঞ্চারের টান ও রাজনৈতিক আগ্রহ।
'বিদ্রোহী'তে 'ভৃগু' শব্দটি দুবার এসেছে, যা অপ্রয়োজনীয় দ্বিরুক্তি।দ্বিতীয়বার আসাটা ভুল, নাকি কবিতার পরিকল্পিত চূড়া?

ভৃগুর দ্বিতীয় আগমন

শেষ অভিযোগটা আলাদা মনোযোগ দাবি করে, কারণ এটাই একমাত্র অভিযোগ যা সরাসরি কবিতার পাঠ নিয়ে। পুরাণে ভৃগু সেই ঋষি, যিনি বিষ্ণুর বুকে পদাঘাত করেছিলেন। কবিতার একেবারে শেষ দিকে 'আমি বিদ্রোহী ভৃগু' উচ্চারণটি পরপর দুবার আসে। 'বিদ্রোহী'র শেষ প্রান্তে তাঁর ফিরে আসা আমার পাঠে পুনরাবৃত্তি নয়, বরং পুরো কবিতার মূল অভিঘাত। এ নিয়ে আমার আলাদা, বিস্তারিত আলোচনা আছে। এখানে প্রাসঙ্গিক কথাটা হলো, খ্যাতিমান গবেষক পুনরাবৃত্তিটাকে কবির অসাবধানতা ধরে নিয়েছেন। সচেতন নির্মাণ হতে পারে, সেই সম্ভাবনাটা তিনি বিবেচনাতেই আনেননি।

একই মানুষ, দুই বিপরীত চরিত্র

অভিযোগগুলো পরস্পরকে কাটে। এক দল দেখান, নজরুল হিসেবি: দশ টাকার জন্য স্কুল ছাড়েন, পয়সার জন্য নাত লেখেন। আরেক দল দেখান, তিনি নিতান্ত সরল। তাঁর শিশুসাহিত্য বেচে বড়লোক হওয়ার আশায় এক প্রকাশক নিজের ভাগনিকে সাজিয়ে তাঁকে প্রেমের ফাঁদে ফেলেছিলেন, এমন বয়ানও আছে। অর্থাৎ তাঁকে বোকা বানিয়ে অনেকেই লাভবান হয়েছেন।

ধূর্ত আর বোকা, একই মানুষের ওপর দুটো ছবিই চাপানো হয়েছে। মিল শুধু এক জায়গায়: দুই ছবিতেই তিনি ছোট। যাঁকে সহজে বোকা বানানো যায়, তিনি আর যা-ই হোন, 'গুরুদেব' গোত্রের কেউ নন। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই যেন উদ্দেশ্য।

অণুবীক্ষণের নিচে শুধু একজন

নজরুলের জামার আস্তিন, ট্রাঙ্কের বাইনোকুলার আর অচেনা কিশোরীর চুলের কাঁটা নিয়ে যে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে, তার লক্ষ্য অন্য বড় লেখকদের জীবনী-চর্চার লক্ষ্য থেকে একেবারে আলাদা।

প্রশ্নটা সাবধানে বোঝা দরকার। শিল্পের বিশ্লেষণের কথা হচ্ছে না, হচ্ছে ব্যক্তির বিশ্লেষণের কথা। নজরুলের প্রবণতা, ঝোঁক আর মতলব বুঝে ফেলার যে বিপুল আকাঙ্ক্ষা গবেষকদের মধ্যে দেখা যায়, তার তুলনা মেলে না। শরৎচন্দ্রের বেলায় এই আকাঙ্ক্ষা কোথায়? জীবনানন্দের বেলায়? হাল আমলের হুমায়ূন আহমেদকেও কি কেউ এই কষ্টিপাথরে ঘষে দেখেছেন?

রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ কিংবা হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিজীবন নিয়েও লেখা কম হয়নি, এ কথা সত্য। কিন্তু তফাতটা মাত্রায় নয়, উদ্দেশ্যে। রবীন্দ্রনাথের জীবনী খোঁড়া হয় তাঁর সৃষ্টিকে আরও ভালো করে বোঝার জন্য। নজরুলের জীবনী খোঁড়া হয় একটা সন্দেহ মেটানোর জন্য: লেখাগুলো সত্যিই তাঁর নিজের বোধ থেকে এসেছে তো? জোড়াসাঁকোর ছেলে উপনিষদ জানবেন, এটা স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। চুরুলিয়ার ছেলে পুরাণ জানলে তার কৈফিয়ত চাওয়া হয়।

একজনের জ্ঞান উত্তরাধিকার, আরেকজনের জ্ঞান সন্দেহজনক সম্পত্তি। দ্বৈত মানদণ্ড বলতে এটাকেই বোঝাচ্ছি।

শোক, ধর্ম এবং 'সেক্যুলার' নজরুলের বিচার

পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরুল আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকেছিলেন, আর এই ঝোঁককে অনেক বিশ্লেষক পড়েছেন তাঁর 'সেক্যুলার' চরিত্রের পতন হিসেবে। কয়েকজনের লেখায় রীতিমতো হাহাকার শোনা যায়: এত সাধের অসাম্প্রদায়িক কবি শেষে সব জলাঞ্জলি দিলেন!

সন্তানহারা একজন বাবার বিশ্বাসের দিকে ফেরা মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বহু পুরোনো এবং বহুল পরিচিত। সেটাকে আদর্শিক বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে পড়তে হলে ধরে নিতে হয়, কবি তাঁর পাঠকের কাছে একটা মতাদর্শিক চুক্তিতে বাঁধা। চুক্তিটা লিখেছেন সমালোচক, কবি নন।

একই সময়ে নজরুল শ্যামাসংগীত আর ইসলামি গান দুই-ই লিখেছেন, এবং দুই ধারাতেই তাঁর রচনা আজও গাওয়া হয়। অথচ শ্যামাসংগীতকে বলা হলো কুসংস্কার, নাত-হামদকে বলা হলো রোজগারের ফিকির। দুই দিক থেকেই আন্তরিকতা বাতিল। যে কবি দুই সম্প্রদায়ের ভক্তির ভাষায় সমান স্বচ্ছন্দ, তাঁকে কোনো এক পক্ষের বলে দাগানো যায় না। আর যাঁকে দাগানো যায় না, তাঁকে অবিশ্বাস করাটাই সহজ।

আসল পরীক্ষাটা অন্য জায়গায়। ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে এই জেরা কি সমকালের বা পরের কোনো তারকা লেখককে করা হয়েছে? করার সাহস কি কেউ দেখিয়েছেন? যাঁর পেছনে পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা অনুরাগী গোষ্ঠীর ঢাল আছে, তাঁকে এই প্রশ্ন করার একটা দাম আছে। নজরুলকে করলে কোনো দাম দিতে হয় না।

শ্রেণির আহত অহম

এত অভিযোগের পেছনে কারণ একটাই: নজরুল আমাদের শ্রেণিবোধকে আঘাত করেছেন। শ্রেণিহীন মানুষকে আক্রমণ করা সহজ, কারণ তাঁর হয়ে জবাব দেওয়ার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।

শিল্প-সাহিত্যের ধারেকাছে না থাকা একটা রিক্ত গ্রাম। সেখানকার এক গরিব পরিবারের অনাদরে বড় হওয়া ছেলে। তার মুখে মহাবিশ্ব কাঁপানো উচ্চারণ। আমাদের চোখে 'শ্রেণি'র যে ছবি আঁকা আছে, এই দৃশ্য তার সঙ্গে মেলে না। সংস্কৃতি কার হাতে থাকবে, সে বিষয়ে ভদ্রলোক সমাজের একটা অলিখিত ধারণা ছিল। নজরুল সেই ধারণায় এমন ধাক্কা দিয়েছেন যে আহত অহমটা চিরাচরিত ভদ্রতার অভিনয় দিয়ে ঢাকা যায়নি।

তাই জোড়াতালি দেওয়া তথ্য দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা চলেছে, নজরুলের বড় বড় বুলি আসলে ফাঁপা। তিনি নিজেই বুঝতেন না কী লিখছেন। এই প্রমাণ দাঁড় করাতে পারলে একটা স্বস্তি মেলে: প্রতিভাটা তাহলে প্রতিভা নয়, দুর্ঘটনা।

আমাদের ভেতরের উঁচু শ্রেণির বাবুটি আসলে বলতে চান, 'সময়-সুযোগ পেলে এটা আমরাও পারতাম।'

এই মনোভাব কেবল বইয়ের পাতায় নেই। 'বিদ্রোহী' নিয়ে আমি যখন কাজ শুরু করি, আমারই এক ঘনিষ্ঠ অগ্রজ ঠোঁট উল্টে বলেছিলেন, 'নজরুল লিখতেন ভালো, কিন্তু সে রকম ডেপথ নেই। এর পেছনে এতটা সময় দেবেন কি না, ভেবে দেখবেন।' গবেষকের সতর্ক বাক্য আর আড্ডার এই মন্তব্য একই জায়গা থেকে আসে।

অস্বীকার করলেই মুছে ফেলা যায় না

এলিটরা স্বীকৃতি দিতে চান না বলে নজরুলের স্বকীয়তা ইতিহাস থেকে মুছে যাবে না, কারণ তাঁর স্বীকৃতি কোনো দিনই তাঁদের হাতে ছিল না। নজরুলকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে মানুষ, সমালোচনা-সাহিত্য নয়।

প্রমাণ তাঁর জীবদ্দশাতেই আছে। ১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর কলকাতার অ্যালবার্ট হলে তাঁকে বাংলার মানুষের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সভাপতি ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, আর সুভাষচন্দ্র বসু সেখানে বলেছিলেন, যুদ্ধে যাওয়ার সময়েও নজরুলের গান গাওয়া হবে, জেলে যাওয়ার সময়েও। কবির বয়স তখন তিরিশ।

এরপরের ইতিহাস আরও স্পষ্ট:

ক্ষেত্রনজরুলের উপস্থিতি
রাষ্ট্রবাংলাদেশের জাতীয় কবি। তাঁর 'চল্ চল্ চল্' বাংলাদেশের রণসংগীত। গানটি রণসংগীত হিসেবে গৃহীত হয় ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২-এ। একই বছরের ২৪ মে তাঁকে সপরিবারে ঢাকায় আনা হয়, ১৯৭৬ সালে দেওয়া হয় নাগরিকত্ব ও একুশে পদক।
মুক্তিযুদ্ধ১৯৭১ সালে তাঁর গান ও কবিতা মুক্তিকামী বাঙালিকে প্রেরণা জুগিয়েছে।
ভারত১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, ১৯৬০ সালে পদ্মভূষণ।
ধর্মীয় সংস্কৃতিবাঙালি মুসলমানের ঈদ শুরু হয় তাঁর গানে। বাঙালি হিন্দুর কালীপূজায় আজও বাজে তাঁর শ্যামাসংগীত।
সংগীতকয়েক হাজার গান (২,২৬০টির পূর্ণ পাঠ সংগৃহীত, সমকালীনদের হিসাবে প্রায় চার হাজার), যা 'নজরুলগীতি' নামে বাংলা গানের একটি স্বতন্ত্র ধারা।
প্রতিষ্ঠানত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, আসানসোলে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। সীমান্তের দুই পারেই তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে চেয়ার, রাজারহাটে 'নজরুল তীর্থ'।

একজন কবির গান একই সঙ্গে ঈদের সকালে, পূজার মণ্ডপে, রাজপথের মিছিলে আর রণাঙ্গনে গাওয়া হচ্ছে, এমন দৃষ্টান্ত এই উপমহাদেশে বিরল। ধার করা কণ্ঠ এত জায়গায় পৌঁছায় না। 'উনি নিজেই বুঝতেন না কী লিখছেন', এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় খণ্ডন কোনো গবেষণাগ্রন্থে নেই। আছে শতবর্ষ ধরে কোটি মানুষের কণ্ঠে।

নজরুল ও এই উপমহাদেশের সম্পর্ক তাই অবিচ্ছেদ্য। তাঁর জন্ম পশ্চিমবঙ্গে, কৈশোরের একটা অংশ ময়মনসিংহে, সৈনিকজীবন করাচিতে, কর্মজীবন কলকাতায়, সমাধি ঢাকায়। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে উঁচু গলার উচ্চারণ তাঁর, এবং সে জন্য তিনি জেলও খেটেছেন। এই বঙ্গের ভাষা, গান, রাজনীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় তাঁর অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যাঁরা অস্বীকার করতে চান, তাঁদের অস্বীকৃতি নজরুলের মাপ কমায় না। কমায় তাঁদের নিজেদের বিচারের মাপ।

শেষ কথা

নজরুলকে প্রশ্ন করা অন্যায় নয়, অন্যায় হলো প্রশ্নটা শুধু তাঁকেই করা। কোনো কবিই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, এবং নজরুলের দুর্বল রচনা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু দুর্বল রচনা চিহ্নিত করা এক কাজ, আর সবল রচনার মালিকানা নিয়ে সন্দেহ তোলা সম্পূর্ণ আলাদা কাজ।

মক্তবে আরবি-ফারসি, লেটোর আসরে পুরাণ ও ছন্দ, ব্যারাকে হাফিজ, সংবাদপত্রে রাজনীতি: নজরুলের পাঠশালা ছড়ানো ছিল, কিন্তু অনুপস্থিত ছিল না। বাইশ বছর বয়সে সেই সব পাঠ এক জায়গায় এসে 'বিদ্রোহী' হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটা সবচেয়ে সরল, অথচ এটাই সবচেয়ে কম শোনা যায়।

গরিবের ছেলের গায়ে ভালো জামা দেখলে প্রথমে চুরির কথা মনে আসে কেন, সে প্রশ্নের উত্তর জামায় নেই। উত্তরটা যিনি দেখছেন, তাঁর চোখে।

তথ্যসূত্র

রফিকুল ইসলাম, "Islam, Kazi Nazrul", বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ। জন্ম, পরিবার, লেটো দল, স্কুল, পল্টন, মুজফ্ফর আহমদ, আলী আকবর খান, গিরিবালা দেবী, কারাদণ্ড ও অনশন, 'বসন্ত' উৎসর্গ, অ্যালবার্ট হলের সংবর্ধনা, বাকশক্তি হারানো, ঢাকায় আনা, নাগরিকত্ব ও একুশে পদক।

"Kazi Nazrul Islam", উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। রুটির দোকান, নার্গিসের সঙ্গে বিয়ের ঘটনা, গানের সংখ্যা, জগত্তারিণী পদক, পদ্মভূষণ, মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা, নজরুল চেয়ার ও নজরুল তীর্থ।

নিয়াজ জামান, "From a Prayer to a Call to Arms and Action", দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ মে ২০২১। 'বিদ্রোহী'র রচনাকাল ও প্রকাশ, 'আনোয়ার পাশা' ও 'কামাল পাশা' কবিতা, ভৃগু প্রসঙ্গ।

নিয়াজ জামান, "The eternal rebel warrior: A hundred years later", দ্য ডেইলি স্টার, ৩০ মে ২০২২। মোহিতলাল মজুমদারের অভিযোগ, নামের আগে 'হাবিলদার' লেখা, করাচিতে ফারসি শিক্ষা, ভৃগুর দুবার উল্লেখ।

"Notuner Gaan", উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। 'চল্ চল্ চল্' রণসংগীত হিসেবে গৃহীত হওয়ার তারিখ।

আরোও পড়ুনঃ

জিন্নাহ ও রবীন্দ্রনাথ: বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে যত বিতর্ক: হিন্দুত্ববাদ নাকি অসাম্প্রদায়িকতা?

Mahfuzur Rahman

লিখেছেন

Mahfuzur Rahman

লেখক সম্পর্কে আরও →

মন্তব্য

মন্তব্য

চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আলোচনায় যোগ দিন

মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।

এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে যত বিতর্ক: হিন্দুত্ববাদ নাকি অসাম্প্রদায়িকতা?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতখানি হিন্দুত্ববাদী ছিলেন? কতখানি ইসলাম বিদ্বেষী কিংবা অসাম্প্রদায়িক ছিলেন? বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নানাবিধ বিষয় নিয়ে এই রচনাটি লেখা।

১৩ মিনিট২৯

পপুলিজম এক মারাত্মক ব্যাধি

২৪-এর পর জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, পপুলিজমের বিস্তার এবং বিপ্লবের অপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষার দায় নিয়ে কিছু কঠিন প্রশ্ন। আমরা কি সত্যিই সেই প্রজন্মকে তার কাঙ্ক্ষিত রাজনীতি দিতে পেরেছি?

৩ মিনিট৬৭