রবীন্দ্রনাথ এই দেশের জন্য তেমন কোনো ব্যক্তি হয়ে যাননি, যাঁকে ছাড়া এই বঙ্গ বা এই দেশ অচল হয়ে যাবে। কথাটা শুনতে রূঢ় লাগতে পারে, কারণ গত পঞ্চাশ বছর ধরে এ দেশের সাংস্কৃতিক মহল উল্টোটাই শিখিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাঙালি অসম্পূর্ণ, রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করা মানে নিজের ভাষাকে অস্বীকার করা।
অথচ এই দেশের ভাষা আন্দোলন রবীন্দ্রনাথের জন্য হয়নি, মুক্তিযুদ্ধও তাঁর নামে হয়নি। এ দেশের চাষি তাঁর গান না জেনেও ধান ফলিয়েছে, এ দেশের মা তাঁর কবিতা না পড়েও ছেলেকে ঘুম পাড়িয়েছে। হাসন রাজা, লালন, জসীমউদ্দীন, নজরুল, আবুল মনসুর আহমদ, শহীদুল্লা কায়সার: এই ভূখণ্ডের নিজের মানুষ নিজের ভাষায় নিজের জীবনের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ সেই ধারার একজন বড় নাম, একমাত্র নাম নন।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য সমাজের জন্য মূলত একটি অপ্রাসঙ্গিক পাঠ। এটা তাঁর একার দুর্ভাগ্য নয়; তাঁর সময়ের প্রায় সব লেখকেরই একই দশা। জমিদারি, ব্রাহ্মসমাজ, স্বদেশি, বঙ্গভঙ্গ: যে পৃথিবী নিয়ে তাঁরা লিখেছেন, সেই পৃথিবীর সঙ্গে আজকের মানুষের জীবন আর মেলে না।
তিনি বিখ্যাত ছিলেন। ভালো লিখতেন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান আছে, তাঁর লেখা পড়তে আনন্দ হয়। এর বেশি কিছু না। তাঁকে জোর করে পূজা করার কিছু নেই।
আবার এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে নিষ্পাপ বা নির্দোষ বানানোও নয়। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগের পক্ষে দলিল আছে, সেগুলো এখানে দলিলসহ আলোচনা হবে। কোথাও তাঁর দায় স্পষ্ট, কোথাও তিনি তাঁর সময়ের সন্তান, কোথাও তিনি নিজেই নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। যে প্রশ্নটা ঘুরেফিরে আসবে তা হলো: হিন্দুত্ববাদ নাকি অসাম্প্রদায়িকতা? আর তার নিচে আরেকটা প্রশ্ন: এই মানুষটিকে ঘিরে একটা জাতির এত আবেগ খরচ করার দরকার আছে কি?
জোড়াসাঁকোর টাকা কোথা থেকে এল
গল্পটা শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের জন্মের অনেক আগে, ১৮৩০-এর দশকের কলকাতায়। গঙ্গার ঘাটে তখন বিলিতি জাহাজ ভিড়ছে, কোম্পানির দপ্তরে কেরানিদের কলম চলছে, আর সেই ভিড়ের মধ্যে এক বাঙালি ধীরে ধীরে সবচেয়ে বড় নাম হয়ে উঠছেন। তাঁর নাম দ্বারকানাথ ঠাকুর। লোকে ডাকত 'প্রিন্স'।
দ্বারকানাথের শুরু সরকারি চাকরিতে। শুল্ক, লবণ ও আফিম বোর্ডের দেওয়ানের মতো উঁচু পদে ছিলেন তিনি। ১৮৩৪ সালে সেই চাকরি ছেড়ে উইলিয়াম কারের সঙ্গে খোলেন কার, ঠাকুর অ্যান্ড কোম্পানি। ব্যাংক, জাহাজ, রানীগঞ্জের কয়লাখনি, নীল, লবণ: কোথাও তাঁর টাকা খাটেনি, এমন খাত কম।
আর ছিল আফিম। এটা ইতিহাসবিদদের স্বীকৃত তথ্য। কার, ঠাকুর অ্যান্ড কোম্পানি চীনে আফিম পাঠাত। চীনের সম্রাট তখন আফিম নিষিদ্ধ করেছেন, কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিলামে বিক্রি করে মুনাফা তুলছে, আর সেই সরবরাহ-শিকলে মাঝারি স্তরের এক অংশীদার ছিলেন দ্বারকানাথ। জমিদার হিসেবেও তাঁর মূল্যায়ন খুব প্রশংসার নয়: দক্ষ, কিন্তু উদার নন।
রবীন্দ্রনাথের যে নিশ্চিন্ত জীবন, শান্তিনিকেতনের যে আশ্রম, বিলেতযাত্রার যে খরচ, তার ভিত গাঁথা হয়েছিল ঔপনিবেশিক বাণিজ্য আর জমিদারির টাকায়। সে টাকার একটা অংশ এসেছিল চীনের আফিমখোরের পকেট থেকে, আরেকটা অংশ পূর্ববঙ্গের মুসলমান চাষির খাজনা থেকে। কবির কলম যত সূক্ষ্মই হোক, কালি কেনার পয়সা আকাশ থেকে আসেনি।
দ্বারকানাথ মারা যান ১৮৪৬ সালে, নাতির জন্মের পনেরো বছর আগে। দাদার ব্যবসার দায় সরাসরি নাতির নয়। কিন্তু উত্তরাধিকারের সুবিধা তিনি পুরোটাই ভোগ করেছেন, এবং যে মানুষকে মানবতার প্রতীক বলা হয়, তাঁর সেই সুবিধার উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা অন্যায় নয়। প্রশ্নটা হলো, উত্তরাধিকারে যা পেয়েছিলেন, তা নিয়ে তিনি কী করলেন।
চিতার গান আর 'হিন্দু মুসলমান'
১৮৭৫ সাল। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে নাটকের মহড়া চলছে। মেজদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লিখেছেন ঐতিহাসিক নাটক 'সরোজিনী'। চিতোরের রাজপুত নারীরা আলাউদ্দিন খিলজির বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার চেয়ে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া শ্রেয় মনে করছে। সেই দৃশ্যের জন্য একটা গান দরকার। গানটা লিখে দেয় বাড়ির চৌদ্দ বছরের ছোট ছেলে, রবি।
জ্বল্ জ্বল্ চিতা, দ্বিগুণ দ্বিগুণ, পরান সঁপিবে বিধবা বালা।
গানের শেষ দিকে আছে 'শোন্ রে যবন' বলে হুমকি, প্রতিফল ভোগের অভিশাপ। গানটি রবীন্দ্রনাথেরই; নাট্যগীতি হিসেবে তাঁর রচনার তালিকায় আছে।
তবে দুটো তথ্য যোগ না করলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে। এক, এটা সাধারণ সতীদাহ নয়; নাটকের প্রেক্ষাপট যুদ্ধে স্বামীহারা রাজপুত নারীদের জহরব্রত, আর 'যবন' বলা হচ্ছে আক্রমণকারী সেনাদের। দুই, গানটা একটা চরিত্রের মুখের, এবং লেখক তখন কিশোর। সেই একই বছর হিন্দুমেলায় তিনি পড়েছিলেন 'হিন্দুমেলার উপহার'; প্রথম জনসমক্ষে আসা।
তবু আসল প্রশ্নটা থেকে যায়। একটা চৌদ্দ বছরের ছেলে দেশপ্রেম শিখছে কোন গল্প দিয়ে? যে গল্পে বীরত্ব মানে রাজপুত, আর শত্রু মানে মুসলমান। উনিশ শতকের কলকাতার হিন্দু ভদ্রলোক সমাজ জাতীয়তার যে পাঠ তৈরি করছিল, তার কাঠামোই ছিল এই। রবীন্দ্রনাথ সেই কাঠামোর ভেতরে বড় হয়েছেন, তার ছাপ তাঁর মনে থেকে গেছে।
দ্বিতীয় বিষয়টা আরও সূক্ষ্ম। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, মুসলমানরা ধর্মে মুসলমান হলেও জাতিতে হিন্দু হতে পারে; অর্থাৎ 'হিন্দু মুসলমান'। ব্রাহ্মরা হিন্দু কি না, এই বিতর্কে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে 'হিন্দু' কোনো একক ধর্মমত নয়, এটা একটা ঐতিহাসিক জাতিপরিচয়; সেই অর্থে খ্রিস্টান বা মুসলমানও এই জাতির ভেতরে পড়ে।
রবীন্দ্রনাথের দিক থেকে এটা ছিল উদারতার চেষ্টা: ধর্ম আলাদা হলেও মাটি এক, ইতিহাস এক। কিন্তু একজন মুসলমান পাঠক এতে শোনেন নিজের পরিচয় মুছে দেওয়ার সুর। কেউ যদি বলে, তুমি আসলে আমারই একটা শাখা, শুনতে আদরের মতো লাগলেও তাতে সমানের মর্যাদা থাকে না। আজ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যখন 'ঘর ওয়াপসি'র কথা বলে, তখন এই পুরোনো যুক্তির প্রতিধ্বনি কানে আসে। ২০১৫ সালে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে রবীন্দ্রনাথের 'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধ থেকেই উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন।
অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের কিছু লেখা হিন্দুত্ববাদীদের হাতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এবং হচ্ছে। এই আশঙ্কাকে অমূলক বলার উপায় নেই। লেখকের উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক, লেখা একবার ছাপা হলে তার ব্যবহারকারী আর লেখক থাকেন না।
'মূঢ়গণ' আর বীরত্বের কল্পনা
১৮৯৮ সাল। ইংরেজ সরকার রাজদ্রোহ আইন কড়া করছে। রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিবাদে লিখলেন 'কণ্ঠরোধ'। তার আগের বছর কলকাতায় একটা দাঙ্গা হয়েছিল, মুসলমান জনতা ইট-পাটকেল নিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিল, কঠোর দমনের মুখে পড়েছিল। প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ তাদের বললেন 'ইতর শ্রেণীর অবিবেচক মুসলমান', 'মূঢ়গণ'; ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়, আর এরা পাটকেলের চেয়ে অনেক শক্ত জিনিস খেয়েছে।
প্রবন্ধের মূল বক্তব্য ছিল, সরকার এক দল লোকের দাঙ্গার অজুহাতে গোটা দেশের মুখ বন্ধ করছে। কিন্তু শব্দগুলো তো ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। শহরের গরিব মুসলমানের প্রতি একজন অভিজাত জমিদারের তাচ্ছিল্য সেখানে স্পষ্ট, তাদের শাস্তি নিয়ে একরকম তৃপ্তিও। এটাকে সাম্প্রদায়িক বলা যায় কি না তর্ক চলতে পারে; শ্রেণিগত অবজ্ঞা বলা যায় নিঃসন্দেহে, আর সেই শ্রেণির নিচের তলায় ছিল মূলত মুসলমান।
ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের বীরত্বগাথা শিখ, রাজপুত আর মারাঠা বীরদের নিয়ে; কোনো মুসলমান বীরের মহিমা নিয়ে তিনি লেখেননি। 'কথা ও কাহিনী'র পাতা ওল্টালে কথাটা মোটামুটি সত্যি মনে হয়: বান্দা বৈরাগী, গুরু গোবিন্দ, ভাই তারু সিং, শিবাজী আছেন; সালাহউদ্দিন বা টিপু সুলতান নেই।
মুসলমান চরিত্র অবশ্য তাঁর লেখায় একেবারে অনুপস্থিত নয়। 'কাবুলিওয়ালা'র রহমত বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মমতামাখা চরিত্রগুলোর একটি। 'দালিয়া'য় শাহ সুজার মেয়েরা আছে। জীবনের একেবারে শেষে, ১৯৪১ সালে, লিখেছেন 'মুসলমানীর গল্প', যেখানে এক হিন্দু মেয়েকে আশ্রয় দেয় এক মুসলমান পরিবার। মজুমদারের নিজের ইতিহাসদৃষ্টি নিয়েও বিতর্ক আছে; অনেকে তাঁকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ঘরানার ইতিহাসবিদ মনে করেন। তবু তাঁর পর্যবেক্ষণের মূল কথাটা টেকে: রবীন্দ্রনাথের বীরত্বের কল্পনায় মুসলমান বীর জায়গা পাননি। এটা হয়তো বিদ্বেষ নয়, কিন্তু একটা অন্ধ কোণ, এবং সেই অন্ধ কোণ তাঁর সময়ের হিন্দু বাঙালি লেখকদের প্রায় সবার ছিল।
শিবাজী-উৎসব থেকে 'ঘরে বাইরে'
১৯০৪ সাল। রবীন্দ্রনাথের বয়স তেতাল্লিশ, কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহলে তিনি প্রতিষ্ঠিত। মহারাষ্ট্রে বাল গঙ্গাধর তিলক কয়েক বছর আগে শিবাজী উৎসব চালু করেছেন; সখারাম গণেশ দেউস্কর তা কলকাতায় এনেছেন। সেই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন 'শিবাজী-উৎসব'।
'এক ধর্মরাজ্যপাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেঁধে দিব আমি।'
এই কবিতা নিয়ে আপত্তি যুক্তিসংগত। যে শিবাজীকে মারাঠা জাতীয়তাবাদীরা মুসলমান শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু প্রতিরোধের প্রতীক বানিয়েছিলেন, তাঁকে 'এক ধর্মরাজ্য' দিয়ে ভারত বাঁধার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে আঁকা নিরীহ কাজ নয়। একই বছর লেখা 'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধও এই সময়ের মানসিকতার দলিল। গবেষক নুরুল ইসলাম মনজুর যে তিলক, দেউস্কর আর রবীন্দ্রনাথের ভাবনাকে এক সুতোয় গেঁথেছেন, ১৯০৪ সালের রবীন্দ্রনাথকে দেখলে সেটা মেনে নিতে হয়।
পরের বছর, ১৯০৫। লর্ড কার্জন বাংলা ভাগ করলেন। পূর্ববঙ্গ আর আসাম নিয়ে তৈরি হলো নতুন প্রদেশ, রাজধানী ঢাকা। এক বছর আগে ঢাকায় দাঁড়িয়ে কার্জন মুসলমানদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পুরোনো মুসলমান শাসকদের পর যে ঐক্য তারা হারিয়েছে, তা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। পূর্ববঙ্গের মুসলমান নেতৃত্বের বড় অংশ নতুন প্রদেশকে দেখলেন শিক্ষা আর চাকরির দরজা হিসেবে। কলকাতার হিন্দু ভদ্রলোক দেখলেন নিজের প্রভাব আর জমিদারির ওপর আঘাত।
রবীন্দ্রনাথ দাঁড়ালেন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে। পথে নেমে গান গাইলেন, রাখিবন্ধনের ডাক দিলেন। এই সময়েই লেখা হয় 'আমার সোনার বাংলা'। ইতিহাসের পরিহাস এই যে, পূর্ববঙ্গের মুসলমান যে বিভাজনকে স্বাগত জানিয়েছিল, তার বিরোধিতায় লেখা গান আজ সেই পূর্ববঙ্গেরই, স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। এই তথ্য অস্বস্তিকর, এবং তা স্বীকার করাই সততা।
কিন্তু গল্প এখানে থামে না। ১৯০৫ সালের রাখিবন্ধনের দিন রবীন্দ্রনাথ পাড়ার মসজিদে গিয়ে মৌলবিদের হাতেও রাখি বেঁধেছিলেন। আর দুই-তিন বছরের মধ্যে তিনি দেখলেন আন্দোলনের আসল চেহারা। পূর্ববঙ্গে চাষিদের বেশির ভাগ মুসলমান; বিলিতি কাপড় সস্তা, দিশি কাপড় দামি। স্বদেশি স্বেচ্ছাসেবকরা জোর করে গরিব চাষির কাপড় পোড়াচ্ছে, হাটে বিলিতি জিনিস বেচা দোকানিকে শাসাচ্ছে। এর পরিণতি গড়াল দাঙ্গায়।
রবীন্দ্রনাথ আন্দোলন থেকে সরে এলেন। ১৯০৭-০৮ সালের প্রবন্ধগুলোতে তিনি দোষ দিলেন নিজের সম্প্রদায়কেই: হিন্দুরা মুসলমানকে কাছে টানার জন্য কিছুই করেনি, অথচ বিপদের দিনে তার সমর্থন চাইছে। শত শত বছর একই মাঠের ফসল খেয়ে, একই নদীর জল পান করে যে দুই সম্প্রদায় পাশাপাশি বেঁচেছে, তাদের মধ্যে ঘৃণার কোনো শাস্ত্রীয় ভিত্তি নেই, এমন কথাও লিখলেন।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিল 'ঘরে বাইরে' (১৯১৬)। উপন্যাসের জমিদার নিখিলেশ স্বদেশির নামে নিজের মুসলমান প্রজাদের ওপর জোর খাটাতে রাজি নন; তার বন্ধু সন্দীপ জাতীয়তাবাদের মোহন বক্তা, যার কাছে দেশপ্রেম মানে ক্ষমতা। উপন্যাসের সহানুভূতি স্পষ্টতই নিখিলেশের দিকে। পরে 'চার অধ্যায়' (১৯৩৪) উপন্যাসে তিনি সশস্ত্র বিপ্লবী রাজনীতির নৈতিক দেউলিয়াপনা দেখালেন। এই দুই উপন্যাসের জন্য কলকাতার জাতীয়তাবাদীরা তাঁকে কম গালি দেয়নি।
তাহলে ছবিটা দাঁড়ায় এমন: ১৯০৪ সালের রবীন্দ্রনাথ হিন্দু জাতীয়তাবাদের কাব্যিক সমর্থক, ১৯১৬ সালের রবীন্দ্রনাথ তার কঠোর সমালোচক। একজন মানুষকে তাঁর জীবনের যেকোনো এক বছর দিয়ে মাপলে বিচার হয় না, হয় সুবিধামতো উদ্ধৃতি।
শিলাইদহ-পতিসরের জমিদার
পদ্মার বুকে একটা বজরা ভাসছে। জানালার পাশে বসে এক তরুণ জমিদার চিঠি লিখছেন ভাইঝিকে: নদীর ধারে সূর্য ডোবে, চরের ওপর নক্ষত্র ওঠে, কলকাতায় থাকলে পৃথিবী যে কী আশ্চর্য সুন্দর তা ভুলে যেতে হয়। এই চিঠিগুলো পরে বই হয়ে বেরোয়, 'ছিন্নপত্র'। বাংলা গদ্যের মণিমুক্তা।
কিন্তু বজরার নিচে যে নদী, তার দুই পাড়ে যে গ্রাম, সেখানে যারা থাকে, তাদের চোখে এই তরুণ কবি নন, জমিদারবাবু। ১৮৯১ সাল থেকে বাবার নির্দেশে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরের জমিদারি দেখতেন; ১৮৯৫ সালে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে পুরো সম্পত্তির কর্তৃত্ব পান। এই অঞ্চলের প্রজাদের বড় অংশ মুসলমান চাষি। তাদের খাজনাই ঠাকুরবাড়ির অন্যতম আয়।
ঠাকুর পরিবারের জমিদারির ইতিহাস নিষ্কলুষ নয়। ১৮৭২ সালে, দেবেন্দ্রনাথের আমলে, শাহজাদপুর-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে অন্যায্য করের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল; ঠাকুর জমিদারি তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সেই বিদ্রোহের চাপেই পরে ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন আসে বলে গবেষকরা মনে করেন। রবীন্দ্রনাথের নিজের আমলে খাজনা বৃদ্ধি আর প্রজা-অসন্তোষের অভিযোগ এসেছে শচীন্দ্র অধিকারী ও অমিতাভ চৌধুরীর লেখার বরাতে। জমিদার যত সংবেদনশীলই হোন, ব্যবস্থাটা ছিল আদায়ের ব্যবস্থা; সে কথা ভুলে গেলে চলে না।
অন্য পাল্লায় যা আছে, সেটাও দলিলে লেখা। নওগাঁর পতিসরে তিনি চালু করেন কালীগ্রাম রবীন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয় আর ছেলের নামে রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন, দুটোই আজও চলছে।
আরও আছে। মহাজনের সুদের ফাঁস থেকে চাষিকে বাঁচাতে পতিসরে তিনি কৃষি ব্যাংক খোলেন, আর ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারের এক লাখ টাকার বড় অংশ সেই ব্যাংকে খাটান। ১৮৯৫ সালে কুষ্টিয়ায় পাটকল খুলেছিলেন, ব্যবসায় লোকসান খেয়েছিলেন। তাঁর জমিদারির কাজ নিয়ে লেখা একটি গবেষণা বলছে, দেবেন্দ্রনাথের কাছে জমিদারি ছিল খাজনা আদায়ের যন্ত্র, রবীন্দ্রনাথ তাকে পল্লি উন্নয়নের পরীক্ষাগার বানাতে চেয়েছিলেন।
তবু একটা প্রশ্ন থেকে যায়, এবং সেটা ন্যায্য। পূর্ববঙ্গের মুসলমান চাষির খাজনায় পুষ্ট পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরে, পূর্ববঙ্গে নয়। শান্তিনিকেতনের জমি দেবেন্দ্রনাথ কিনেছিলেন ১৮৬৩ সালে, তাই এর পেছনে সচেতন সাম্প্রদায়িক হিসাব খোঁজা কঠিন। কিন্তু টাকা কোথা থেকে আসে আর কোথায় গিয়ে প্রতিষ্ঠান হয়, ঔপনিবেশিক বাংলার এই মানচিত্রটা পূর্ববঙ্গের বিরুদ্ধেই ছিল। রবীন্দ্রনাথ সেই মানচিত্রের সুবিধাভোগী।
একজন ভালো জমিদার তবু জমিদার। পতিসরের স্কুল আর কৃষি ব্যাংক সেই সত্যকে মুছে দেয় না, শুধু পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
পৈতা আর ইসলাম
ব্রাহ্ম, তবু পৈতা। ১৮৭৩ সালে বারো বছরের রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন হয়, মাথা মুড়িয়ে পৈতা পরানো হয়। এখানে একটা সত্যিকারের স্ববিরোধ আছে। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন আদি ব্রাহ্মসমাজের প্রধান, অথচ পৈতা ছাড়েননি। এই প্রশ্নেই কেশবচন্দ্র সেনের অনুসারীরা তাঁর সঙ্গ ছেড়ে আলাদা সমাজ গড়েছিলেন। অর্থাৎ ঠাকুরবাড়ির ব্রাহ্মধর্ম ছিল হিন্দু সমাজের ভেতরের এক সংস্কার আন্দোলন, বাইরের কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেও পরে লিখেছেন, ব্রাহ্মরা হিন্দুই। যাঁরা ব্রাহ্ম পরিচয় দেখিয়ে তাঁকে হিন্দু সমাজের বাইরের মানুষ প্রমাণ করতে চান, তাঁদের যুক্তি তাই দুর্বল।
তবে হিন্দু সমাজের ভেতরের মানুষ হওয়া আর হিন্দুত্ববাদী হওয়া এক নয়। বর্ণপ্রথা, ছোঁয়াছুঁয়ি, আচারসর্বস্বতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের কলম আজীবন চলেছে; 'গোরা' উপন্যাসের পুরো যাত্রাটাই একজন গোঁড়া হিন্দুর নিজের পরিচয় ভেঙে মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।
ইসলাম ও নবী প্রসঙ্গ। একটি পুরোনো ক্ষোভ, রবীন্দ্রনাথ ইসলাম ও মহানবী সম্পর্কে প্রায় কিছুই লেখেননি। সংখ্যার হিসাবে কথাটা সত্যের কাছাকাছি।
যা পাওয়া যায় তা অন্য রকম। ১৯৩৩ সালে নবী দিবসের এক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের পাঠানো বাণী পড়ে শোনান সরোজিনী নাইডু। সেখানে তিনি ইসলামকে পৃথিবীর মহান ধর্মগুলোর অন্যতম বলেছেন, আর বলেছেন সেই কারণেই তার অনুসারীদের দায়িত্বও গভীর। ১৯৩২ সালে, সত্তর পেরোনো বয়সে, তিনি পারস্য আর ইরাক সফর করেন; শিরাজে হাফিজের সমাধিতে গিয়েছিলেন।
এতে প্রমাণ হয় না যে ইসলাম নিয়ে তাঁর গভীর চর্চা ছিল। তাঁর বিপুল রচনায় ইসলাম ও মুসলমান ঐতিহ্য প্রান্তিক জায়গাই পেয়েছে, এই পর্যবেক্ষণ সঠিক। কিন্তু প্রান্তিক জায়গা আর বিদ্বেষ এক জিনিস নয়।
সবশেষে,
শুনানি শেষ। দলিলে যা দাঁড়াল, তা গুছিয়ে বলা যাক।
রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক সম্পদের একটা অংশ এসেছিল আফিম বাণিজ্য আর জমিদারি থেকে। কৈশোরে তিনি এমন গান লিখেছেন যেখানে মুসলমান শত্রু। মধ্যবয়সে শিবাজীর বন্দনা করেছেন, মুসলমানকে 'হিন্দু জাতির' অংশ বলে টেনেছেন, গরিব মুসলমান দাঙ্গাকারীদের 'মূঢ়গণ' বলেছেন। পূর্ববঙ্গের মুসলমান যে বঙ্গভঙ্গকে সুযোগ হিসেবে দেখেছিল, তার বিরোধিতা করেছেন। ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মেও পৈতা পরেছেন। তাঁর বীরত্বের কল্পনায় মুসলমান বীর নেই, তাঁর বিশাল রচনায় ইসলাম প্রান্তিক। তাঁর জমিদারির খাজনা দিয়েছে পূর্ববঙ্গের মুসলমান চাষি।
একই দলিলে আরও আছে: ১৯০৭ সালের পর তিনি নিজের সম্প্রদায়কেই দায়ী করেছেন মুসলমানকে দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য, 'ঘরে বাইরে' লিখে উগ্র জাতীয়তাবাদের মুখোশ খুলেছেন, পতিসরে স্কুল আর কৃষি ব্যাংক গড়েছেন। এগুলো তাঁকে নির্দোষ বানায় না, শুধু ছবিটা পূর্ণ করে।
তাহলে হিন্দুত্ববাদ নাকি অসাম্প্রদায়িকতা? সৎ উত্তর হলো, কোনোটাই পুরোপুরি নয়। তিনি উনিশ শতকের কলকাতার এক হিন্দু অভিজাত পরিবারের সন্তান। সেই সমাজের সংস্কার নিয়ে জন্মেছিলেন, জীবনের বড় অংশ তার কিছুটা ভাঙতে চেষ্টা করেছেন, সবটা পারেননি। তাঁর সময়ের হিন্দু বাঙালি লেখকদের মধ্যে তিনি হয়তো উদারদের দলে, কিন্তু 'সময়ের তুলনায় উদার' আর 'সর্বজনীন মানবতার প্রতীক' এক কথা নয়। দ্বিতীয় দাবিটা তাঁর ওপর চাপানো হয়েছে, তিনি নিজে তা অর্জন করেননি।
এখানেই মূল কথায় ফেরা। রবীন্দ্রনাথ এই দেশের জন্য তেমন কোনো ব্যক্তি হয়ে যাননি, যাঁকে ছাড়া এই বঙ্গ বা এই দেশ অচল হয়ে যাবে। এই দেশ বায়ান্নতে নিজের ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, একাত্তরে নিজের মানচিত্র আদায় করেছে, চব্বিশে আবার রাস্তায় নেমেছে। এর কোনোটার শর্ত রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না। যে জাতি এতবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তাকে একজন কলকাতার জমিদার-কবির ছায়ায় নিজের সংস্কৃতির বৈধতা খুঁজতে হয় না।
২০২৬ সালের বাংলাদেশে তিনি মূলত একটি অপ্রাসঙ্গিক পাঠ। এটা অপমান নয়, সময়ের নিয়ম। যে তরুণ আজ ঢাকার জ্যামে বসে মোবাইলে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করে, যে মেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যে চাষি এখন নিজেই জমির মালিক, তাদের জীবনের প্রশ্নের উত্তর শিলাইদহের বজরায় লেখা হয়নি। জমিদার আর প্রজার সম্পর্ক, ব্রাহ্মসমাজের তর্ক, স্বদেশির কাপড় পোড়ানো: এগুলো এখন ইতিহাসের বিষয়, জীবনের নয়। তাঁর সমসাময়িক প্রায় সব লেখকের বেলাতেই কথাটা সত্য।
তাহলে তাঁকে নিয়ে কী করা উচিত? সবচেয়ে সাধারণ কাজটাই। পড়তে ইচ্ছে হলে পড়া যায়, যেভাবে আমরা শেক্সপিয়র বা মির্জা গালিব পড়ি: ভাষার জন্য, গল্পের জন্য, ইতিহাস বোঝার জন্য। 'পোস্টমাস্টার'-এর রতন, 'ছুটি'র ফটিক এখনো পড়লে বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে ওঠে। গান ভালো লাগলে শোনা যায়। কিন্তু তাঁকে জাতির নৈতিক অভিভাবক বানানোর দরকার নেই, তাঁর সমালোচনাকে দেশদ্রোহ ভাবারও দরকার নেই।
পদ্মা এখনো বয়। শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে লোকে বেড়াতে যায়, ছবি তোলে, ফিরে আসে। ফিরে এসে যার যার জীবনে ঢুকে পড়ে, যে জীবন রবীন্দ্রনাথকে ছাড়াই দিব্যি চলছে। একজন বিখ্যাত মানুষ, যিনি ভালো লিখতেন, যাঁর লেখা পড়তে ভালো লাগে, যাঁর দায়ও ছিল তাঁর সময়ের মতোই ভারী। এর বেশি কিছু না।
তথ্যসূত্র
Dwarkanath Tagore, উইকিপিডিয়া; ব্লেয়ার ক্লিংয়ের Partner in Empire অবলম্বনে। কার, ঠাকুর অ্যান্ড কোম্পানি ও চীনে আফিম রপ্তানি।
Rabindranath Tagore (1861-1941), উমা দাশগুপ্ত, পরবাস। শুল্ক, লবণ ও আফিম বোর্ডের দেওয়ান পদ, ১৮৩৪ সালে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা।
Remembering Dwarkanath Thakur, দ্য কুইন্ট। আফিম বাণিজ্যে দ্বারকানাথের অবস্থান।
Prince Dwarkanath Tagore, পুরোনো কলকাতা। জমিদার হিসেবে তাঁর মূল্যায়ন।
জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ (নাট্যগীতি), বাংলা লাইব্রেরি; Jyotirindranath Tagore, উইকিপিডিয়া ('সরোজিনী', ১৮৭৫)।
On May 9, What Could Amit Shah Say on Rabindranath Tagore, জনতা উইকলি। শিবাজী-উৎসব, স্বদেশী সমাজ, মোহন ভাগবতের উদ্ধৃতি।
Rabindranath Tagore's politics, দ্য ওয়্যার। রাখিবন্ধন, মসজিদে রাখি, মুসলমান চাষির ওপর বয়কটের চাপ।
Tagore: A Biographical Chronology। হিন্দুমেলা ১৮৭৫, কুষ্টিয়ার পাটকল ১৮৯৫, স্বদেশি থেকে সরে আসা, পারস্য-ইরাক সফর।
Ghare Baire: About the Book। ১৯০৪ সালে ঢাকায় কার্জনের বক্তৃতা, স্বদেশির পতন।
শাহজাদপুরের কৃষক বিদ্রোহের (১৮৭২) নেপথ্যে জমিদার পরিবারের ভূমিকা, সুলতানা সুকন্যা বাশার।
জমিন্দারির পুনঃনির্ধারণ, মো. সিদ্দিক হোসেন। ১৮৯৫ সালের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি।
পতিসরে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী, বাসস। কৃষি ব্যাংক, কালীগ্রাম রবীন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়, রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন।
রবীন্দ্রনাথ, ইসলাম ও মুসলিম ঐতিহ্য, প্রথম আলো। ১৯৩৩ সালের নবী দিবসের বাণী।
আরোও লেখা পড়ুনঃ
জিন্নাহ ও রবীন্দ্রনাথ: বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন





মন্তব্য
মন্তব্য
চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।
আলোচনায় যোগ দিন
মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।
এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।