অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি আইএমএফের প্রোগ্রাম বাতিলের ঘোষণা দিয়ে উন্নয়ন অর্থায়নে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে মূল উৎস হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ: “ক্যাপিটাল মার্কেট ইজ দ্য আন্সার, বন্ড মার্কেট ইজ দ্য আন্সার।” কিন্তু একই সময়ে দেশের শেয়ারবাজারের অবস্থা দিনকে দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। আইএমএফ কিংবা বিশ্বব্যাংকের ঋণের শর্ত মানার দিন শেষ; এখন বাজার থেকে অর্থ তোলা হবে। তিনি দাবি করেছেন, “আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে।” বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কিন্তু বাজারের প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। ডিএসইএক্স সূচক ৪ অক্টোবর ২০২৬-এ ৪৯.৩ পয়েন্ট কমে ৫,৪৮২-এ নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের ৫,৫৩২ থেকে পতন। সপ্তাহজুড়ে সূচকটি ৪৬ পয়েন্ট (০.৮৪%) কমেছে, যা আগের দুই সপ্তাহের সমস্ত লাভ মুছে দিয়েছে। বাজার মূলধন এক সপ্তাহেই ৪,৬৩৬ কোটি টাকা কমে ৬,৮৫,৯৩৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। দৈনিক গড় লেনদেন ১০% কমে ৭০৬ কোটি টাকায় নেমেছে। ৩৯৫টি ইস্যুর মধ্যে ২৯০টি দরপতনের শিকার, যা ব্যাপক বিক্রয়চাপের সাক্ষ্য বহন করে।
পতনের কারণ
পতনের পেছনে একাধিক কারণ সক্রিয়। লিটারে ২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে কোম্পানিগুলোর মুনাফার মার্জিন কমার শঙ্কা তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৯.৫% অপরিবর্তিত রাখায় ঋণগ্রহণের খরচ বেড়ে বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জুন মাসে সমাপ্ত কোম্পানিগুলোর দুর্বল আয় প্রতিবেদন বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তুলেছে। বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত ইতিবাচক ট্রিগার না পেয়ে নতুন অবস্থান নিতে অনিচ্ছুক।
বাস্তবতা
অর্থমন্ত্রী বন্ড মার্কেটকে ‘উত্তর’ বললেও বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে কার্যকর বন্ড মার্কেট এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান নিজেই স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের কার্যকর বন্ড মার্কেট দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে ব্যাংক ঋণের তুলনায় বেশি সময় ও খরচ লাগে। করপোরেট বন্ড ইস্যুতে উচ্চ খরচ, জটিল নিয়মকানুন এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের অভাব বন্ড মার্কেট বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। দেশে বর্তমানে মাত্র ১৬টি তালিকাভুক্ত করপোরেট বন্ড ইস্যুকারী রয়েছে।
ডিএসই চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম স্পষ্ট বলেছেন, “শেয়ারবাজারে যত সংস্কারই করা হোক, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।” অতীতের অনিয়ম ও অদক্ষতার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আস্থা ফেরানো ছাড়া বিকল্প নেই। পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজার মূল অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ও বাজারের বাস্তবতার মধ্যে গভীর ব্যবধান চোখে পড়ার মতো। একদিকে আইএমএফের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে ‘উত্তর’ ঘোষণা, অন্যদিকে সূচকের টানা পতন, লেনদেনের সংকোচন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। বন্ড মার্কেট কার্যকর না হলে এবং শেয়ারবাজারে স্থায়ী আস্থা ফিরিয়ে আনা না গেলে অর্থমন্ত্রীর সেই ‘উত্তর’ কেবল বক্তৃতার উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বক্তব্য ও বাস্তবতার এই ব্যবধান দূর করতে শুধু সংস্কারের ঘোষণা নয়, তার দৃশ্যমান ও সময়বদ্ধ বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি কিন্তু তার কোনো লক্ষণ অতীতেও দেখিনি এখনোও দেখছি না।
আরোও পড়ুনঃ





মন্তব্য
মন্তব্য
চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।
আলোচনায় যোগ দিন
মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।
এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।