Cover of আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

বই আলোচনা

আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

ভেতর থেকে দেখা ইতিহাস

লেখক আবুল মনসুর আহমদ

৫ / ৫ — কালজয়ী

উপমহাদেশে বাঙালি মুসলমানের রাজনীতি বুঝতে চাইলে যে বই না পড়ে উপায় নেই, এটা সেই বই।
আলোচকMahfuzur Rahman

· ৩ মিনিটে পড়া

এই আলোচনায়৫টি অংশ
  1. লেখক কে
  2. যা একে আলাদা করেছে
  3. বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মজিজ্ঞাসা
  4. কেন আজও প্রাসঙ্গিক
  5. শেষ কথা

ইতিহাস সাধারণত লেখেন দূরে বসে থাকা মানুষ। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন ঘরের ভেতর থেকে। খেলাফত আন্দোলনের মিছিল থেকে করাচির মন্ত্রিসভা পর্যন্ত, পুরো পথটা তিনি হেঁটেছেন নিজের পায়ে। এই বই সেই পথের হিসাব।

নামটাই বইয়ের দাবি। 'আমার দেখা'। এটা কোনো নিরপেক্ষ পাঠ্যবই হওয়ার ভান করে না। এটা একজন সাক্ষীর জবানবন্দি, যিনি একই সঙ্গে খেলোয়াড়ও ছিলেন। আর ঠিক সেই কারণেই বইটা এত মূল্যবান।

লেখক কে

আবুল মনসুর আহমদকে অনেকে চেনেন 'আয়না' আর 'ফুড কনফারেন্স'-এর ধারালো ব্যঙ্গলেখক হিসেবে। কিন্তু সেটা তাঁর পরিচয়ের একটা অংশ মাত্র।

ময়মনসিংহের ধানীখোলা গ্রামে জন্ম। তরুণ বয়সে কংগ্রেস আর খেলাফত আন্দোলনে। পরে কৃষক-প্রজা পার্টিতে, যার ১৯৩৭ সালের নির্বাচনী ইশতেহার তাঁরই লেখা। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রস্তাব তোলেন, লেখেন ঐতিহাসিক ২১ দফা। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী, তারপর সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী। এর ফাঁকে 'কৃষক', 'নবযুগ', 'ইত্তেহাদ'-এর মতো পত্রিকার সম্পাদনা।

অর্থাৎ যে ইতিহাস তিনি লিখেছেন, তার অনেকগুলো খসড়া তাঁর নিজের হাতেই লেখা।

বইটা পঞ্চাশ বছরের বাংলার রাজনীতির ধারাবিবরণী। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের উত্থান, শেরেবাংলা ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা, মুসলিম লীগের রাজনীতি, পাকিস্তান আন্দোলন, দেশভাগ, যুক্তফ্রন্টের বিজয়, আর পাকিস্তানের প্রথম দশকের অস্থির ক্ষমতার খেলা। শেষ হয় আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের ছায়ায়।

কিন্তু এটা শুধু ঘটনার তালিকা নয়। প্রতিটা মোড়ে লেখক থামেন, প্রশ্ন করেন: সিদ্ধান্তটা কেন নেওয়া হলো, কে লাভবান হলো, কোথায় ভুল হলো। পাঠক তাই কেবল কী ঘটেছিল তা জানেন না, কেন ঘটেছিল সেটাও বোঝেন।

যা একে আলাদা করেছে

সাক্ষী যখন নিজেই খেলোয়াড়। ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, শেখ মুজিব, এঁরা এই বইয়ে দূরের কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নন। তাঁরা লেখকের সহকর্মী, বন্ধু, কখনো প্রতিপক্ষ। বৈঠকঘরের আলাপ, দলের ভেতরের টানাপোড়েন, পর্দার পেছনের দরকষাকষি, যা কোনো সরকারি নথিতে নেই, তা এখানে আছে।

ব্যঙ্গলেখকের কলম। 'আয়না'র লেখক যখন রাজনীতির ইতিহাস লেখেন, তখন সেটা শুকনো হতে পারে না। গুরুগম্ভীর ঘটনার মাঝেও হঠাৎ এক চিলতে রসিকতা, এক বাক্যের তীক্ষ্ণ মন্তব্য। এই রসবোধ বইটাকে পাঠযোগ্য রাখে, আর অনেক সময় দীর্ঘ বিশ্লেষণের চেয়েও বেশি সত্য বলে দেয়।

বর্ণনার পাশে বিচার। এটা কেবল স্মৃতির দিনলিপি নয়, একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিকের মূল্যায়নও। ঘটনা বলার পর লেখক থেমে যান না, তার অর্থ খোঁজেন, সিদ্ধান্তের ফলাফল মেপে দেখেন। তাই বইটা একই সঙ্গে ইতিহাসের দলিল আর রাজনীতির পাঠ।

সরল, স্বচ্ছ গদ্য। জটিল সাংবিধানিক প্রশ্ন, দলীয় সমীকরণ, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের মতো ভারী বিষয়ও তিনি লেখেন আড্ডার ভঙ্গিতে, সাধারণ পাঠকের ভাষায়। পাঁচ দশকের রাজনীতি পড়তে পাঠকের হাঁপ ধরে না।

বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মজিজ্ঞাসা

বইয়ের গভীরে একটা প্রশ্ন সারাক্ষণ বয়ে চলে: বাংলার মুসলমান কৃষক, যে জমিদার আর মহাজনের চাপে পিষ্ট, তার রাজনৈতিক মুক্তির পথ কোনটা?

লেখক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন কংগ্রেসে, কৃষক-প্রজা আন্দোলনে, পাকিস্তান আন্দোলনে, আর শেষে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে। প্রতিটা অধ্যায়ে দেখা যায়, স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবের সঙ্গে ধাক্কা খায়, আর একটা জনগোষ্ঠী কীভাবে বারবার নিজের পরিচয় নতুন করে খোঁজে। ১৯৭১ বুঝতে হলে তার আগের পঞ্চাশ বছর বুঝতে হয়। এই বই সেই পঞ্চাশ বছরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভেতরের সাক্ষ্যগুলোর একটা।

কেন আজও প্রাসঙ্গিক

বইটা প্রকাশের পর অর্ধশতাব্দীর বেশি পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এর প্রশ্নগুলো পুরোনো হয়নি। দলের ভেতরে গণতন্ত্র, নেতার ব্যক্তিত্ব বনাম দলের নীতি, কেন্দ্র আর প্রদেশের ক্ষমতার ভাগ, সামরিক শাসনের ছায়া, এসব আলোচনা আজকের রাজনীতিতেও সমান জীবন্ত।

আজও গবেষক, সাংবাদিক আর রাজনীতির ছাত্রদের কাছে বইটা প্রথম সারির সূত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বইটা নিয়ে আলাদা পাঠ-পর্যালোচনা সভা হয়। একটা স্মৃতিকথার জন্য এটা কম সম্মান নয়।

শেষ কথা

'আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর' এমন এক বই, যেটা ইতিহাসকে মানুষের মুখ দেয়। নেতারা এখানে পাথরের মূর্তি নন, রক্তমাংসের মানুষ, যাঁরা ভুল করেন, ঝগড়া করেন, আবার এক টেবিলে বসেন। আর তাঁদের মাঝখানে বসে আছেন একজন লেখক, যিনি সবকিছু দেখছেন, মনে রাখছেন, এবং শেষে আমাদের জন্য লিখে রেখে গেছেন।

বইটা মোটা। কিন্তু প্রতিটা পাতা নিজের জায়গা অর্জন করে নিয়েছে।

রায়

5/5

উপমহাদেশে বাঙালি মুসলমানের রাজনীতি বুঝতে চাইলে যে বই না পড়ে উপায় নেই, এটা সেই বই।

যাঁদের পড়া উচিত: যারা বাংলাদেশের জন্মের আগের ইতিহাস ভেতর থেকে বুঝতে চান, রাজনীতি ও ইতিহাসের ছাত্র, সাংবাদিক, আর যারা আবুল মনসুর আহমদকে শুধু 'আয়না'র লেখক হিসেবে চেনেন।

বইটি পড়তে চান?

আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর

আবুল মনসুর আহমদ

এখনই কিনুন