ষাটের দশকের শেষভাগের পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তরুণ প্রজন্মের আদর্শিক উন্মাদনাকে ধারণ করে রচিত এক অনন্য উপন্যাস ‘মাতাল হাওয়া’। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী গণঅভ্যুত্থান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল চত্বর এবং তৎকালীন তরুণ সমাজের মুক্তির স্বপ্ন ও ব্যক্তিগত দোলাচল নিয়ে এই উপন্যাসের গল্প আবর্তিত। তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রাখলেও হুমায়ূন আহমেদ আসলে মানুষের ভেতরের সূক্ষ্ম রাজনীতি ও মনস্তত্ত্বকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুখে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখ এবং স্বপ্নভঙ্গ কীভাবে রাজনৈতিক মঞ্চের সমান্তরালে বয়ে চলে।
উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলোর মধ্যে লেখক মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের তর্ক, চায়ের দোকানের উন্মাদনা, মিছিলে স্লোগান দেওয়া এবং একই সাথে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কিংবা একটি গোপন প্রেমের অনুভূতির জন্য ব্যাকুল হওয়া সবটাই উঠে এসেছে জীবন্তভাবে। তৎকালীন ছাত্র রাজনীতির আদর্শবাদী রূপ, যেখানে ক্ষমতার লোভের চেয়ে দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ বড় ছিল, তা লেখক অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন। তবে এই রাজনৈতিক উত্তাপের সমান্তরালে লেখক এঁকেছেন সম্পর্কের সূক্ষ্ম ও জটিল নকশা। চরিত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ নিঃসঙ্গতা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের সাথে তাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার লড়াই পাঠককে আবেগাপ্লুত করে।
উপন্যাসের ভাষা অত্যন্ত কাব্যিক ও গতিশীল। ষাটের দশকের ঢাকার রূপ রিকশার টুংটাং শব্দ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গাছগাছালি, তৎকালীন রেস্তোরাঁর পরিবেশ এবং কারফিউর রাতের থমথমে আবহাওয়া লেখক অত্যন্ত জীবন্তভাবে পুনর্নির্মাণ করেছেন। কোনো অতি-নাটকীয়তা তৈরি না করেও কেবল সংলাপের ওঠানামার মধ্য দিয়ে লেখক বড় বড় ঐতিহাসিক মুহূর্তকে দৃশ্যমান করেছেন। রাজনৈতিক আদর্শ কীভাবে ব্যক্তিগত জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে এবং সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতরেও ভালোবাসা কীভাবে টিকে থাকার প্রেরণা জোগায়, তা এই উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য। এটি কোনো একমুখী রাজনৈতিক প্রচারণামূলক লেখা নয়, বরং রাজনীতির ঘুর্ণিপাকে আটকে পড়া মানুষের এক গভীর আত্মানুসন্ধান।





