Cover of ময়ূরাক্ষী

বই আলোচনা

ময়ূরাক্ষী

বস্তুবাদবিরোধী নিরাসক্ত দর্শনের সূচনা এবং তারুণ্যের মানসিক জগতে প্রবল প্রভাব বিস্তারকারী কাল্ট সৃষ্টি।

লেখক হুমায়ূন আহমেদ

৪.৫ / ৫ — অসাধারণ

যুক্তি ও নিয়মের শৃঙ্খল ভেঙে মানুষের অবচেতন মুক্তির স্বাদ দেওয়া এক দুর্দান্ত মনস্তাত্ত্বিক সৃষ্টি, যা একটি প্রজন্মকে পথ হাঁটার নতুন অর্থ শিখিয়েছে।
আলোচকMahfuzur Rahman

· ২ মিনিটে পড়া

বাংলা সাহিত্যে যে চরিত্রটি একটি প্রজন্মের তারুণ্যকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে, সেই ‘হিমু’ চরিত্রের প্রথম আবির্ভাব ঘটে ‘ময়ূরাক্ষী’ উপন্যাসের মাধ্যমে। হিমু কোনো সাধারণ চরিত্র নয়; সে এক উদ্দেশ্যহীন পরিব্রাজক, যে হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে শহরের ধুলোবালি মেখে হেঁটে বেড়ায়। কোনো পার্থিব সঞ্চয়, পেশা কিংবা সামাজিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা সে করে না। তার বাবা তাকে তৈরি করেছিলেন এক ‘মহাপুরুষ’ বানানোর অদ্ভুত দর্শনে, যার কাজ হবে নিঃস্বার্থভাবে নির্লিপ্ত থাকা এবং মানুষের অন্তর্গত রূপ দেখা। ‘ময়ূরাক্ষী’ কেবল একটি চরিত্রের গল্প নয়, এটি বস্তুবাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও উদাসীন বিদ্রোহ।

উপন্যাসের মূল শক্তি হলো এর অদ্ভুত দার্শনিক আবহ এবং হিমুর আপাত-উদ্ভট কর্মকাণ্ডের পেছনের গভীর অন্তর্দৃষ্টি। হিমু কোনো জাদুকর নয়, কিন্তু তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এত তীক্ষ্ণ যে সে মানুষের অবচেতন মন পড়তে পারে এবং এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করে বসে যা অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। উপন্যাসে রূপা চরিত্রটি হিমুর এই আপাত বৈরাগ্যের বিপরীতে পার্থিব ভালোবাসার প্রতীক। রূপা হিমুকে ভালোবাসে, তার জন্য অপেক্ষা করে, কিন্তু হিমু কখনো নিজেকে কোনো সম্পর্কের সুতোয় বাঁধে না। তার কাছে ভালোবাসা কোনো অধিকার নয়, বরং এক দূরবর্তী নদী যেমন তার কল্পনার নদী ‘ময়ূরাক্ষী’, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই, কিন্তু যা তার আত্মার ভেতরে সতত প্রবহমান।

হুমায়ূন আহমেদের স্বভাবসুলভ রসবোধ, ছোট ছোট রহস্য এবং অদ্ভুত সব চরিত্রের সমাবেশ উপন্যাসটিকে এক ভিন্ন মাত্রার গতি দিয়েছে। শহরের মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের স্বার্থপরতা, লোভ ও হিসেবি জীবনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে হিমুর এই নিরাসক্ত জীবনযাপন পাঠককে স্বস্তি দেয় এবং একই সাথে নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। লেখক এখানে অবাস্তব কোনো মায়াজাল তৈরি করেননি, বরং ঢাকার পরিচিত রাজপথ, ফুটপাত এবং রাতের নির্জনতাকে এমনভাবে এঁকেছেন যেন পুরো শহরটাই হিমুর পদচারণায় এক নতুন রূপ ধারণ করেছে। যুক্তি এবং অযৌক্তিকতার সীমানা যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, ‘ময়ূরাক্ষী’ ঠিক সেই বিন্দুতেই আঘাত করে।

মানুষ কেবল যুক্তির জালে বাঁচে না, অযৌক্তিক ভালোবাসার টানেই মানুষ তার সমস্ত নিয়ম ভাঙতে শেখে।
— হুমায়ূন আহমেদ

রায়

4.5/5

যুক্তি ও নিয়মের শৃঙ্খল ভেঙে মানুষের অবচেতন মুক্তির স্বাদ দেওয়া এক দুর্দান্ত মনস্তাত্ত্বিক সৃষ্টি, যা একটি প্রজন্মকে পথ হাঁটার নতুন অর্থ শিখিয়েছে।

যাঁদের পড়া উচিত: যারা প্রচলিত সামাজিক নিয়মের বাইরে মুক্ত জীবনের দর্শন, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মানুসন্ধানের গল্প ভালোবাসেন।

বইটি পড়তে চান?

ময়ূরাক্ষী

হুমায়ূন আহমেদ

এখনই কিনুন
একই লেখকের আরও আলোচনাসব আলোচনা →
এই ধারার আরও আলোচনাসব আলোচনা →