Cover of হাজার বছর ধরে

বই আলোচনা

হাজার বছর ধরে

আবহমান গ্রামবাংলার স্থবির জীবন, আদিম প্রবৃত্তি ও নিঃশব্দ দ্রোহের আখ্যান

লেখক জহির রায়হান

৫ / ৫ — কালজয়ী

কালজয়ী এক ক্লাসিক, যা সনাতন বাংলার সমাজব্যবস্থার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রেম, বঞ্চনা ও অস্তিত্বের লড়াইকে অনবদ্য মমতায় মূর্ত করেছে।
আলোচকMahfuzur Rahman

· ৩ মিনিটে পড়া

বাংলা কথাসাহিত্যে গ্রামকে উপজীব্য করে অজস্র সৃষ্টি রচিত হয়েছে, কিন্তু জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসটি যে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তা এক স্বতন্ত্র মর্যাদার দাবিদার। ১৯৬৪ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত এই আখ্যান কোনো চমকপ্রদ রোমাঞ্চ বা কৃত্রিম নাটকীয়তার আশ্রয়ে গড়ে ওঠেনি। বরং লেখক এখানে ক্যামেরার লেন্সের মতো নিঃশব্দ ও নির্লিপ্ত অথচ গভীর সহানুভূতিশীল দৃষ্টি নিয়ে অবলোকন করেছেন এক নিস্তরঙ্গ জনপদকে। নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডের মাটির গন্ধ, শ্যাওলাধরা পুকুরপাড়, জোছনাস্নাত রাত আর কুসংস্কারের নিবিড় আঁধারে বন্দি মানুষের প্রাত্যহিকতাই এই উপন্যাসের প্রাণভোমরা।

উপন্যাসের মূল সুরটি বাঁধা আছে তার শিরোনামেই। হাজার বছর ধরে বাংলার গ্রামীণ সমাজ যেভাবে প্রবাহিত হয়ে চলেছে, তার ভেতর দৃশ্যত কোনো বড় পরিবর্তন নেই। জন্ম, বিবাহ, জরা, খরা, মহামারি আর মৃত্যু এই চক্রেই বাঁধা তাদের জীবন। সেই সনাতন সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য চরিত্র মকবুল। মধ্যবয়সী, ধর্মভীরু এবং অত্যন্ত অনুদার এই মাতব্বর সুলভ পুরুষ একাধিক বিয়ে করেছে তার পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য আর লালসাকে বৈধতা দিয়ে। তার প্রথমা স্ত্রী আম্বিয়া বয়সের ভারে ন্যূব্জ ও অবহেলিত, অথচ ভাগ্যের কাছে সম্পূর্ণ সমর্পিত। এই সংসারে যখন টুনি নামের চঞ্চল, প্রাণোচ্ছ্বল এক তরুণীর পদার্পণ ঘটে, তখনই সংঘাতের অন্তঃসলিলা সুরটি বেজে ওঠে।

টুনি চরিত্রটি কেবল এক নারীর প্রতিচ্ছবি নয়, সে যেন বাঁধনহারা প্রকৃতির এক রূপক। সেই মুক্ত প্রাণের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় মন্তু, এক অনাথ তরুণ, যার হৃদয়ে কোনো আড়ম্বর নেই, আছে এক নিঃশব্দ সততা। মন্তু ও টুনির সম্পর্কটি জহির রায়হান যে শৈল্পিক পরিমিতিবোধ দিয়ে এঁকেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। লেখক তাদের আবেগকে কোনো অতিনাটকীয় রূপ দেননি, বরং নিষিদ্ধ ভালোবাসার চোরাস্রোতকে দেখিয়েছেন গভীর বিষাদ আর সংযমে। টুনির বুকের ভেতরের হাহাকার, মন্তুর প্রতি তার অঘোষিত টান এবং সমাজের শিকলে বন্দি হয়ে থাকার তীব্র যন্ত্রণা পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়।

একই সঙ্গে উপন্যাসে উপস্থিত অন্যান্য চরিত্র, যেমন বৃদ্ধ কালামাতুল্লা, ফকিরের কেরামতি, গ্রামের মেয়েদের অবদমিত ইচ্ছা এবং বর্ষার ভেজা রাতের একাকীত্ব উপন্যাসের ক্যানভাসকে অসাধারণ গভীরতা দিয়েছে। যখন গ্রামে কলেরা বা মহামারির মতো বিপর্যয় নেমে আসে, তখন মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও অসহায়ত্ব একে অপরের সমান্তরালে ফুটে ওঠে। মকবুল তার বহুবিবাহ ও কঠোর শাসনের ভেতর দিয়ে নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা ক্ষয়িষ্ণু সত্তাকেই টিকিয়ে রাখতে চায়। শেষ পর্যন্ত নিয়তির মার তাকেও অন্ধ ও পঙ্গু করে দেয়, তবু সেই সমাজের চাকা থামে না।

জহির রায়হানের ভাষা এখানে চিত্রধর্মী এবং পরিশীলিত। গ্রামীণ সংলাপের প্রয়োগে তিনি কৃত্রিমতার আশ্রয় নেননি, বরং স্বাভাবিক ধ্বনিমাধুর্য বজায় রেখেছেন। উপন্যাসের আবহ তৈরি করতে তিনি প্রকৃতির আলো ছায়াকে ব্যবহার করেছেন চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবিম্ব হিসেবে। এই উপন্যাস নিছক কোনো ব্যক্তিমানুষের গল্প নয়, এটি একটি অঞ্চলের সমষ্টিগত চৈতন্যের দলিল। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনৈতিক বা সামাজিক কাঠামো হয়তো বদলেছে, কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রবৃত্তি, ভালোবাসা, ক্ষুধা এবং বঞ্চনার ইতিহাস আজও বহুলাংশে এক রয়ে গেছে। এখানেই জহির রায়হানের শিল্পসার্থক কলমের চূড়ান্ত বিজয়।

চারপাশে অন্ধকার। নিশুতি রাত। দূরে কোথায় যেন ডেকে চলেছে এক নিশাচর পাখি। বহু কাল ধরে, বহু যুগ ধরে সে যেন এমনি ডেকে চলেছে।
— জহির রায়হান

রায়

5/5

কালজয়ী এক ক্লাসিক, যা সনাতন বাংলার সমাজব্যবস্থার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রেম, বঞ্চনা ও অস্তিত্বের লড়াইকে অনবদ্য মমতায় মূর্ত করেছে।

যাঁদের পড়া উচিত: বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত আবেদন যারা উপলব্ধি করতে ভালোবাসেন, গ্রামীণ সমাজকাঠামো ও সমাজবিজ্ঞান নিয়ে যাদের আগ্রহ রয়েছে এবং যারা অতিনাটকীয়তাহীন মানবহৃদয়ের জটিল সম্পর্কের গভীর বয়ান পড়তে চান, তাদের প্রত্যেকের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।

বইটি পড়তে চান?

হাজার বছর ধরে

জহির রায়হান

এখনই কিনুন