কারাগার বলতে আমরা বুঝি তালা, শিক, পাহারাদার। হুমায়ূন আহমেদের কারাগারে এসবের কিছুই নেই। আছে একটা ভাড়া বাড়ি, একজন সৎ ও নিরীহ বাবা, একজন দূরের মানুষ হয়ে থাকা মা, আর ছয় ভাইবোনের একটা সংসার। কেউ কাউকে আটকে রাখে না। তবু কেউ বেরোতে পারে না।
নামটাই আসলে উপন্যাসের চাবি। শঙ্খের মতো নীল, স্নিগ্ধ, সুন্দর একটা রং। আর তার পাশে কারাগার। হুমায়ূন দেখান, মধ্যবিত্ত সংসার ঠিক এমনই: বাইরে থেকে কোমল, ভেতর থেকে বন্দি। আর সেই বন্দিত্বের দেয়াল গাঁথা হয়েছে ভালোবাসা, দায় আর না-বলা কথা দিয়ে।
গল্পটা কী নিয়ে
গল্প বলে খোকা, সংসারের বড় ছেলে। তার বড় বোন রাবেয়া বয়সে তার চেয়ে ছয় বছরের বড়, অবিবাহিত, আর পুরো সংসারটা আসলে তার কাঁধেই চলে। ছোট ভাইবোনদের আবদার, বাবার অসহায়তা, মায়ের নীরবতা সব সামলায় সে, হাসিমুখে।
মা এই সংসারে থেকেও যেন নেই। তাঁর চোখে একটা দূরত্ব, একটা পুরোনো ছায়া, যার কথা কেউ মুখে আনে না। ভাইবোনেরা বড় হয়, প্রেমে পড়ে, ভুল করে, ঘর ছাড়ে। আর এর ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে খুলতে থাকে পরিবারের অতীত।
শেষে এসে একটা পুরোনো সত্য সামনে আসে, যা আগের সব পাতাকে নতুন করে পড়তে বাধ্য করে। সেটা এখানে বলব না। এই উপন্যাসের শেষ পাতাটা পাঠকের নিজে পড়া দরকার।
যা একে আলাদা করেছে
নীরবতাই এখানে ভাষা। হুমায়ূন সবচেয়ে বড় কথাগুলো বলেন না-বলে। মায়ের দীর্ঘশ্বাস, বাবার অপ্রস্তুত হাসি, রাবেয়ার হঠাৎ চুপ করে যাওয়া, এগুলোই গল্পের আসল সংলাপ। পাঠক ফাঁকগুলো নিজে ভরাট করেন, আর তাতেই গল্পটা তাঁর নিজের হয়ে যায়।
সরল বাক্যে গভীর ভার। ছোট ছোট বাক্য, প্রতিদিনের শব্দ, কোনো ভারী অলংকার নেই। অথচ পড়া শেষে বুকের ভেতর একটা ভার থেকে যায়। সহজ করে বলা যে কতটা কঠিন শিল্প, এই বই তার প্রমাণ।
হাসি আর বেদনা একই নিঃশ্বাসে। ভাইবোনের খুনসুটি, ছোটদের পাকামি, সংসারের মজার টুকরো মুহূর্ত, এসবের পাশেই চলে এক গভীর বিষাদ। হাসিগুলো বেদনাকে ঢেকে দেয় না, বরং আরও স্পষ্ট করে। কারণ পাঠক জানেন, এই উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো দীর্ঘস্থায়ী নয়।
পরিবারটাই নায়ক। এখানে কোনো একক নায়ক নেই, কোনো আদর্শের বক্তৃতা নেই। আছে একটা মধ্যবিত্ত সংসারের আটপৌরে দিনরাত্রি। হুমায়ূন প্রমাণ করেছেন, সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনেও মহাকাব্যের সমান গভীরতা থাকতে পারে।
রাবেয়া: যে নিজের জন্য কিছু রাখেনি
উপন্যাসের প্রাণ রাবেয়া। সে সংসারের অঘোষিত অভিভাবক, ভাইবোনদের দ্বিতীয় মা। সবার দরকার সে বোঝে, শুধু নিজের দরকারটা কেউ জিজ্ঞেস করে না।
হুমায়ূন তাকে আত্মত্যাগের প্রতিমা বানাননি। রাবেয়া রসিক, প্রাণবন্ত, তীক্ষ্ণ। তার হাসির আড়ালে যে নিঃসঙ্গতা, সেটা ধরা পড়ে খুব আলতো করে, এক-দুটো বাক্যে। বাংলা সাহিত্যে বড় বোনের চরিত্র অনেক আছে, কিন্তু রাবেয়ার মতো এমন মমতা আর মর্যাদা নিয়ে আঁকা চরিত্র কম।
মা: নীরবতার রহস্য
উপন্যাসের সবচেয়ে রহস্যময় মানুষ মা। তিনি সন্তানদের ভালোবাসেন, অথচ তাঁর ভালোবাসা যেন কাচের ওপাশ থেকে আসে। কেন তিনি এমন, সেই প্রশ্নই গল্পকে নিঃশব্দে টেনে নিয়ে যায়।
হুমায়ূন উত্তরটা তাড়াহুড়ো করে দেন না। টুকরো টুকরো ইঙ্গিত দেন, পাঠককে অপেক্ষা করান। যখন উত্তর আসে, তখন মায়ের প্রতিটি নীরবতা নতুন অর্থ পায়। এটা কোনো চমকের কৌশল নয়, এটা চরিত্রের প্রতি লেখকের গভীর সম্মান।
'নন্দিত নরকে'র সঙ্গে আত্মীয়তা
দুটো উপন্যাসেই আছে খোকা, রাবেয়া, মন্টু। নামগুলো এক, কিন্তু মানুষগুলো আলাদা, সম্পর্কগুলো আলাদা, গল্প আলাদা। যেন একই পরিবারের ছাঁচে লেখক দুটো আলাদা জীবন গড়েছেন।
পাশাপাশি পড়লে একটা মজার জিনিস চোখে পড়ে। 'নন্দিত নরকে'তে বিপদ আসে বাইরে থেকে, একটা অপরাধের রূপ নিয়ে। 'শঙ্খনীল কারাগার'-এ বিপদ ভেতরের, অতীতের, না-বলা সত্যের। প্রথমটা ঝড়, দ্বিতীয়টা ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভাঙন। দুটো মিলে মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা পূর্ণ মানচিত্র তৈরি হয়।
শেষ কথা
'শঙ্খনীল কারাগার' এমন একটা বই, যেটা পড়ার সময় মনে হয় নিজের বাড়ির কথা পড়ছি। সেই একই ভাড়া বাসা, একই টানাটানি, একই ভালোবাসা, যেটা মুখে বলা হয় না। হুমায়ূন আহমেদ এখানে কোনো উপদেশ দেননি, কোনো সমাধানও দেননি। শুধু দেখিয়েছেন, আমরা সবাই কোনো না কোনো শঙ্খনীল কারাগারে থাকি। আর সেই কারাগারকে আমরা ভালোবাসি।
বইটা এক বসায় শেষ হয়। রেশটা শেষ হয় না।






