Cover of দেয়াল

বই আলোচনা

দেয়াল

ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য, ক্ষমতা ও মানুষের অনিশ্চিত বিবেক

লেখক হুমায়ূন আহমেদ

৫ / ৫ — কালজয়ী

দেয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়কে সাহিত্যে ধারণ করার তাৎপর্যপূর্ণ প্রচেষ্টা।
আলোচকMahfuzur Rahman

· ৪ মিনিটে পড়া

এই আলোচনায়৩টি অংশ
  1. কাহিনি, চরিত্র ও ইতিহাসের দ্বৈত আখ্যান
  2. ভাষা ও নির্মাণশৈলী: পরিচিত হুমায়ূন, ভিন্ন এক পরিসর
  3. শেষকথা

একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন রাজনৈতিক ঘটনাবলি কেবল রাষ্ট্রের গতিপথ বদলে দেয় না, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়, বিশেষত ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী ক্ষমতার পালাবদল, তেমনই এক জটিল অধ্যায়। এই সময়কে সাহিত্যে ধারণ করা সহজ নয়। কারণ এখানে ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক বিতর্ক, ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যাসহ নানাবিধ পটপরিবর্তন কেন্দ্রিক ঘটনা।

হুমায়ূন আহমেদের দেয়াল সেই জটিল সময়কে উপন্যাসের বিষয় করে তুলেছে। তাঁর লক্ষ্য কেবল পরিচিত রাজনৈতিক ঘটনাকে পুনরায় বর্ণনা করা নয়; বরং ঘটনাগুলোর মধ্যে মানুষকে স্থাপন করা। তাদের আকাঙ্ক্ষা, ভয়, আনুগত্য এবং অসহায়তার মুখোমুখি দাঁড় করানো। ফলে উপন্যাসটি পাঠককে একই সঙ্গে ইতিহাসের দিকে তাকাতে এবং ইতিহাসকে বোঝার নিজস্ব পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আহ্বান জানায়।

এখানে ‘দেয়াল’কে একটি তাৎপর্যপূর্ণ রূপক হিসেবেও পাঠ করা যায়। দেয়াল যেমন মানুষকে পৃথক করে, তেমনি আড়ালও তৈরি করে; একদিকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়, অন্যদিকে দৃষ্টির সীমা নির্ধারণ করে। রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন দেয়াল নির্মিত হয়। ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে, রাষ্ট্রের ঘোষিত সত্য ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে, এমনকি একই ইতিহাস সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যেও। উপন্যাসটির পাঠে এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

কাহিনি, চরিত্র ও ইতিহাসের দ্বৈত আখ্যান

দেয়াল-এর বর্ণনায় বাস্তব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি কাল্পনিক চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অবন্তী ও শফিকের মতো চরিত্রের ব্যক্তিগত জীবন একদিকে উপন্যাসকে মানবিক ও কথাসাহিত্যিক মাত্রা দিয়েছে; অন্যদিকে খন্দকার মোশতাক আহমদ, জিয়াউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান, খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহেরের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি আখ্যানটিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।

এই দুই ধরনের চরিত্রের সহাবস্থান উপন্যাসটির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। বাস্তব ইতিহাসের চরিত্রগুলো রাষ্ট্র ও ক্ষমতার বৃহত্তর গতিপথকে সামনে নিয়ে আসে, আর কাল্পনিক চরিত্রগুলো সেই ইতিহাসের মধ্যে ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব, সম্পর্ক ও অনুভূতির জন্য জায়গা তৈরি করে। ফলে রাজনীতি এখানে নিছক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও।

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিবরণে যখন ব্যক্তিমানুষের পরিচয় কেবল ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন সহিংসতার প্রকৃত মূল্য আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সেই বিমূর্ততার আড়াল সরিয়ে মানুষের জীবন, মৃত্যু ও শোককে দৃশ্যমান করা। দেয়াল-এর প্রাথমিক রূপের কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ নিয়ে বিভিন্ন কারণে রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে পরবর্তী প্রকাশিত সংস্করণে পরিবর্তন আনা হয়।

পনেরোই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের যে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়, দেয়াল তারই একটি সাহিত্যিক চিত্র নির্মাণ করে। ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা, খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো এই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

হুমায়ূন আহমেদ এই সময়কে কেবল তারিখ ও ঘটনার ধারাবাহিকতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর বর্ণনায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও মানসিকতার ওপর সেই পরিবর্তনের অভিঘাতও গুরুত্ব পেয়েছে। 

ভাষা ও নির্মাণশৈলী: পরিচিত হুমায়ূন, ভিন্ন এক পরিসর

হুমায়ূন আহমেদের বহুল পরিচিত গদ্যভঙ্গির প্রধান বৈশিষ্ট্য সাবলীলতা, সংলাপের স্বাভাবিকতা এবং চরিত্রের প্রতি সহজাত মনোযোগ। দেয়াল-এও এই বৈশিষ্ট্যগুলো উপস্থিত। তবে বিষয়বস্তুর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক জটিলতা তাঁর পরিচিত পারিবারিক কিংবা মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের তুলনায় ভিন্ন ধরনের বর্ণনাভঙ্গির দাবি করেছে।

এখানে গল্প বলার স্বাভাবিক প্রবাহের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ঘটনা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সময়ের বিবরণকে স্থান দিতে হয়েছে। ফলে কোনো কোনো অংশে কাহিনির গতি শিথিল হয় এবং ঘটনাবলির বিবরণ তুলনামূলকভাবে প্রাধান্য পায়। আনিসুজ্জামান বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন। 

উপন্যাসটির মূল্য কেবল এর কাঠামোগত নিখুঁততার ওপর নির্ভর করে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি সংবেদনশীল অধ্যায়কে কথাসাহিত্যের আলোচনায় নিয়ে আসা এবং পাঠককে সেই সময়ের নৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি দাঁড় করানোও এর উল্লেখযোগ্য অবদান।

শেষকথা 

দেয়াল এমন একটি উপন্যাস, যার তাৎপর্য এর কাহিনির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর বিষয়বস্তু বাংলাদেশের ইতিহাসকে কীভাবে স্মরণ করা হবে, কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে এবং ইতিহাসের সত্যের সঙ্গে সাহিত্যিক কল্পনার সম্পর্ক কোথায় নির্ধারিত হবে সেই প্রশ্নগুলোকেও সামনে নিয়ে আসে।

হুমায়ূন আহমেদ স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কথাসাহিত্যের পরিসরে তুলে এনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সময়ের প্রতি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাঁর নির্মিত চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহ পাঠককে ক্ষমতা, সহিংসতা, আনুগত্য এবং মানুষের নৈতিক দায় সম্পর্কে ভাবতে উৎসাহিত করে। 

রায়

5/5

দেয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়কে সাহিত্যে ধারণ করার তাৎপর্যপূর্ণ প্রচেষ্টা।

যাঁদের পড়া উচিত: বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাস, শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ড, সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাজনীতি ও ব্যক্তিমানুষের সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের জন্য উপন্যাসটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

বইটি পড়তে চান?

দেয়াল

হুমায়ূন আহমেদ

এখনই কিনুন
একই লেখকের আরও আলোচনাসব আলোচনা →
এই ধারার আরও আলোচনাসব আলোচনা →