মধ্যাহ্ন মানে দুপুর। দিনের সেই সময়, যখন ছায়া সবচেয়ে ছোট আর রোদ সবচেয়ে কড়া। কিছুই লুকানো যায় না। হুমায়ূন আহমেদ এই নামটা বেছে নিয়েছেন একটা গ্রামের জন্য, যেখানে চল্লিশ বছর ধরে মানুষের লোভ, ভালোবাসা, ধর্ম আর দয়া একেবারে খোলা রোদে দাঁড়িয়ে থাকে।
গ্রামটার নাম বান্ধবপুর। আর বইটা আসলে কোনো একজন মানুষের গল্প নয়। এটা একটা সময়ের গল্প, যে সময়টা ভাঙছে, বদলাচ্ছে, আর ভেতর থেকে নতুন একটা দেশ তৈরি হওয়ার শব্দ তুলছে।
গল্পটা কী নিয়ে
উপন্যাস শুরু হয় এক পুকুরঘাটে। পঞ্চাশ বছরের হরিচরণ সাহা বসে আছেন, বান্ধবপুরের সৎ ব্যবসায়ী, নিঃসঙ্গ মানুষ। জহির নামের এক মুসলমান শিশুকে আপন করে নেওয়ার অপরাধে সমাজ তাঁকে একঘরে করেছে। এই এক সিদ্ধান্তের ভেতরেই ধরা আছে গোটা বইয়ের প্রশ্ন: মানুষ বড়, না তার পরিচয়?
হরিচরণকে ঘিরে জড়ো হয় আরও অনেকে। জহিরের মা জুলেখা, যে স্বামীর ঘর ছেড়ে নিজের পথ নিজে খোঁজে। ব্রাহ্মণ থেকে মুসলমান হওয়া অম্বিকা ভট্টাচার্য, যিনি দুই পরিচয়ের মাঝখানে আটকে পড়েন। স্বদেশি আন্দোলনের তরুণ শশী। টিকিট বাবু থেকে জমিদার হয়ে ওঠা চতুর ধনু শেখ। আর সোনাদিয়ার জমিদার শশাঙ্ক পাল, যাঁর দম্ভ শেষ পর্যন্ত তাঁকেই গ্রাস করে।
এসব জীবনের পেছনে বয়ে চলে বড় ইতিহাস: বঙ্গভঙ্গ, স্বদেশি আন্দোলন, ব্রিটিশ রাজের খেতাব-বাণিজ্য, আর শেষে দেশভাগের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু ইতিহাস এখানে মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়ায় না। দাঁড়িয়ে থাকে মঞ্চের পেছনে, আলো ফেলে মানুষগুলোর মুখে।
যা একে আলাদা করেছে
একটা গ্রাম, এক মহাদেশের ছবি। বান্ধবপুর ছোট গ্রাম, কিন্তু তার ভেতরে গোটা উপমহাদেশ ধরা পড়ে। হিন্দু-মুসলমান, জমিদার-প্রজা, ব্রাহ্মণ-কবিরাজ-মৌলানা, নটীবাড়ি থেকে মসজিদ, সবাই এক মাটিতে। হুমায়ূন দেখান, বড় ইতিহাস আসলে ছোট মানুষদের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তের যোগফল।
ইতিহাস আছে, ইতিহাসের ভার নেই। তারিখ, সন্ধি, যুদ্ধের হিসাব দিয়ে পাঠককে ক্লান্ত করেন না লেখক। ইতিহাস আসে কারও মুখের গুজবে, কারও খেতাবে, কারও হারিয়ে যাওয়ায়। ফলে বইটা পাঠ্যবই হয়ে ওঠে না, থেকে যায় জীবন্ত গল্প।
সহজ ভাষায় বিশাল ক্যানভাস। কয়েক ডজন চরিত্র, চার দশকের সময়, তবু একটা বাক্যও ভারী নয়। হুমায়ূনের চেনা ছোট বাক্য, সংলাপের চটুলতা আর নির্লিপ্ত বর্ণনা এখানে বিশাল এক কাহিনিকে অনায়াসে বহন করে। এত বড় গল্প এত হালকা পায়ে বলা যায়, এই বই তার প্রমাণ।
কেউ পুরো ভালো নয়, কেউ পুরো মন্দও নয়। ধনু শেখ লোভী, কিন্তু হাস্যকর আর মানবিক। শশাঙ্ক পাল দাম্ভিক, কিন্তু তাঁর পতন পাঠককে নাড়া দেয়। হুমায়ূন চরিত্রদের বিচার করেন না, বোঝার চেষ্টা করেন। পাঠকও তাই ঘৃণা করার আগে থমকে দাঁড়ান।
হরিচরণ: যে মানুষ দেয়াল মানেনি
হরিচরণ উপন্যাসের নৈতিক কেন্দ্র। তাঁর বীরত্ব কোনো যুদ্ধে নয়, একটা শিশুকে কোলে তুলে নেওয়ায়। সেই এক কাজের দাম তিনি সারাজীবন দেন, সমাজচ্যুত হয়ে, একা থেকে।
তবু হরিচরণ তিক্ত হন না। তাঁর ভেতরে আছে মৃত মেয়ে শিউলির স্মৃতি, যে শৈশবে ডুবে মারা গিয়েছিল কিন্তু বাবার মন থেকে কখনো যায়নি। এই শোকই হয়তো তাঁকে অন্যের সন্তানকে আপন করার সাহস দিয়েছে। হুমায়ূন হরিচরণকে সাধু বানাননি, বানিয়েছেন সাধারণ এক মানুষ, যিনি একটা অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
জুলেখা: নিজের গল্প নিজে লেখা নারী
বইয়ের সবচেয়ে সাহসী চরিত্র সম্ভবত জুলেখা। স্বামীকে ছেড়ে আসে, পরিবারের কাছে ফেরে না, আর সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার কোণ পেরিয়ে একদিন কলকাতার গায়িকা চানবিবি হয়ে ওঠে।
একশো বছর আগের এক গ্রামের মেয়েকে হুমায়ূন যে স্বাধীনতা আর জেদ দিয়েছেন, তা আজও চমকে দেয়। জুলেখার গল্পে করুণা নেই, আছে মর্যাদা। সে কারও দয়ার পাত্র নয়, নিজের ভাগ্যের মালিক।
ইতিহাসের ছায়ায় সত্যিকারের মানুষ
কল্পনার চরিত্রদের পাশে উপন্যাসে ঘোরাফেরা করে বাস্তবের কিছু মুখ। উকিল মুনশি, যাঁর গান আজও বাংলার মানুষের মুখে মুখে, এখানে রক্তমাংসের চরিত্র। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কবি সরাসরি আসেন না, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যায় কথায়, প্রসঙ্গে।
এই মিশেলটা বইকে একটা বিশেষ বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়। পাঠক বুঝতে পারেন না কোথায় ইতিহাস শেষ আর কোথায় কল্পনা শুরু। আর সেটাই ভালো গল্পকারের আসল জাদু।
হুমায়ূনের শিল্পীজীবনের মধ্যাহ্ন
নামটার আরেকটা অর্থও আছে। 'নন্দিত নরকে' আর 'শঙ্খনীল কারাগার'-এ যে লেখক একটা পরিবারের ভেতরে ঢুকেছিলেন, 'মধ্যাহ্ন'-তে তিনি পুরো একটা সমাজ, পুরো একটা যুগ ধরতে চেয়েছেন। পরিবারের গল্প থেকে জাতির গল্পে এই যাত্রাই তাঁর পরিণতির চিহ্ন।
'জোছনা ও জননীর গল্প' যেমন মুক্তিযুদ্ধকে ধরেছে, 'মধ্যাহ্ন' তেমনি ধরেছে তার আগের অর্ধশতাব্দী, যে সময়ে বীজ বোনা হয়েছিল। দুটো বই পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, হুমায়ূন আহমেদ কেবল জনপ্রিয় গল্পকার ছিলেন না, ছিলেন তাঁর দেশের এক নিভৃত ইতিহাসবিদও।
শেষ কথা
'মধ্যাহ্ন' পড়া শেষ হলে মনে হয়, একটা গোটা গ্রাম থেকে বিদায় নিয়ে এলাম। হরিচরণের পুকুরঘাট, সোহাগগঞ্জের হাট, জুম্মাঘরের আজান, নটীবাড়ির গান, সব কিছু থেকে যায় মনের ভেতর।
এটা সেই বিরল বই, যেটা ইতিহাস শেখায় কিন্তু পড়ায় না। মানুষ চেনায়, বিচার করে না। আর মনে করিয়ে দেয়, দেয়াল যত উঁচুই হোক, একজন হরিচরণ সবসময় থাকেন।




