পর্ব ২ / ২রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

জিন্নাহ ও রবীন্দ্রনাথ: বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন

জিন্নাহর জন্য মালা, রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি: বাংলাদেশপন্থার নামে চলা দ্বৈত মানদণ্ডের একটি তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ।

Mahfuzur Rahmanলেখক
Published
Reading time
১৩ মিনিটের পাঠ
পাঠসংখ্যা
১৪ বার পড়া হয়েছে
জিন্নাহ ও রবীন্দ্রনাথ: বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি পাশাপাশি। সাথে ভারত ও পাকিস্তানের মানচিত্র
এই লেখায়১০টি অংশ
  1. প্রশ্নটা যেভাবে উঠছে
  2. জিন্নাহ: মুছে ফেলার মতো নন, মাথায় তোলার মতোও নন
  3. রবীন্দ্রনাথ কীভাবে 'ওদের' হয়ে গেলেন
  4. অভিযোগের খাতা, এবং তথ্যের জবাব
  5. একই দাঁড়িপাল্লা: বঙ্গভঙ্গ বনাম রাষ্ট্রভাষা উর্দু
  6. রিলস, মব আর এক মৃত মানুষের বিচার
  7. রবীন্দ্রনাথ বনাম নজরুল: একটা ভুল ছক
  8. বয়কট নয়, পূজাও নয়
  9. শেষ কথা
  10. তথ্যসূত্র

প্রশ্নটা যেভাবে উঠছে

একটা জাতি কাকে মনে রাখবে আর কাকে ভুলবে, সেই সিদ্ধান্ত সাধারণত হয় পাঠ্যবইয়ে, গবেষণায়, প্রকাশ্য তর্কে। বাংলাদেশে সেই সিদ্ধান্ত এখন হচ্ছে দেয়ালে আর মঞ্চে।

২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে দশজন বিশিষ্ট মানুষের প্রতিকৃতি আঁকে। সেই তালিকায় নজরুল, জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্রনাথও। কয়েক দিনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি লেপে দেওয়া হয়। যিনি কালি লেপেছিলেন, তিনি সাংবাদিকদের কাছে কারণ হিসেবে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন, তিনি বাংলাদেশবিরোধী। পরে তিনি নিজেই বক্তব্য বদলান।

এর দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, জাতীয় প্রেস ক্লাবে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পালিত হয়েছিল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী, উর্দু কবিতা আর উর্দু গান দিয়ে। বক্তারা বলেছিলেন, জিন্নাহ না থাকলে পাকিস্তান হতো না, পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও হতো না। একজন তাঁকে 'আমাদের জাতির পিতা' পর্যন্ত বলেছিলেন। অথচ ১৯৪৮ সালে এই শহরের কার্জন হলেই ছাত্ররা জিন্নাহর উর্দু-ঘোষণার মুখে 'না, না' বলে প্রতিবাদ করেছিল। একই মাসে দাবি ওঠে, 'আমার সোনার বাংলা' ভারতের চাপিয়ে দেওয়া গান, তাই জাতীয় সংগীত বদলাতে হবে।

একজনের জন্য স্মরণসভা, আরেকজনের মুখে কালি। প্রশ্নটা তাই আর তাত্ত্বিক নয়: জিন্নাহকে যদি এ দেশে নায়ক হিসেবে দেখা যায়, তাহলে রবীন্দ্রনাথকে ঠিক কোন যুক্তিতে বাংলাদেশবিরোধী বলা হয়?

শুরুতেই অবস্থান পরিষ্কার করি। এ লেখা রবীন্দ্রনাথের প্রশস্তিপত্র নয়, জিন্নাহর বিরুদ্ধে অভিযোগনামাও নয়। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি, আবার তিনিই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। কেউ যদি চান এ দেশের জাতীয় সংগীত লিখুন এই মাটিরই কোনো সন্তান, সেই চাওয়াকে আমি অন্যায় মনে করি না। রবীন্দ্রনাথকে পুরো দায়মুক্তি দেওয়ার ইচ্ছাও এ লেখার নেই। কিশোর বয়সে হিন্দু মেলার মঞ্চে হিন্দু জাতির গৌরবগাথা পাঠ থেকে শুরু করে 'শিবাজী-উৎসব'-এ এক ধর্মরাজ্যের স্বপ্ন পর্যন্ত, তাঁর জীবনের প্রথম অর্ধেকে হিন্দু পুনর্জাগরণবাদী জাতীয়তাবাদের ছাপ স্পষ্ট। আজকের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তাঁকে যে নিজেদের লোক বলে দাবি করে, সেই দাবির উপাদান তিনি নিজেই রেখে গেছেন। কিন্তু সেই উপাদান দিয়ে প্রতীকটা কারা গড়েছে, কেন গড়েছে, সেটাও জানা জরুরি।

প্রশ্নটা তাই পদ্ধতি নিয়ে। একজন মানুষকে মিথ্যা অভিযোগে কলঙ্কিত করে, ইতিহাসকে ভুল খাতে বইয়ে দিয়ে, মবের হাতে বিচারের ভার তুলে দিয়ে কি সত্যিকারের কোনো সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সম্ভব? রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন, শোষক ছিলেন, ভিনদেশি ছিলেন, ব্রিটিশঘেঁষা ছিলেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতীক ছিলেন — তর্কের খাতিরে সব মেনে নিলেও প্রশ্ন থেকে যায়: ১৯৪১ সালে মারা যাওয়া একজন মানুষের ছবিতে চুনকালি মাখিয়ে কোন সমস্যার সমাধান হলো? ভারতীয় আধিপত্যের জবাব কি একজন মৃত কবির চরিত্রহনন, নাকি নিজের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে দাঁড় করানো?

জিন্নাহ: মুছে ফেলার মতো নন, মাথায় তোলার মতোও নন

জিন্নাহকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া যায় না, কারণ ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গ যে মানচিত্রে ঢুকেছিল, তার প্রধান স্থপতি তিনি। আবার তাঁকে উদযাপনও করা যায় না, কারণ বাঙালির ভাষা ও আত্মপরিচয়ের ওপর প্রথম রাষ্ট্রীয় আঘাতটা এসেছিল তাঁর মুখ থেকেই। দুটোই ইতিহাস। দুটোকে একসঙ্গে মনে রাখাই সৎ পাঠ।

সময়ঘটনাবাংলাদেশের জন্য তাৎপর্য
২৩ মার্চ ১৯৪০মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশন। জিন্নাহর সভাপতিত্বে প্রস্তাব উত্থাপন করেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক। মুসলিমপ্রধান উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল নিয়ে গঠিত হবে একাধিক 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ'। প্রস্তাবে 'পাকিস্তান' শব্দটি কোথাও ছিল না।পূর্বাঞ্চলের স্বতন্ত্র সার্বভৌমত্বের ধারণা গোড়া থেকেই ছিল, আর তার প্রস্তাবক ছিলেন একজন বাঙালি।
এপ্রিল ১৯৪৬দিল্লি কনভেনশনে বহুবচন 'রাষ্ট্রসমূহ' বদলে একবচন 'রাষ্ট্র' করা হয়। বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাশিম আপত্তি তুললে জিন্নাহ বহুবচনকে নিছক ছাপার ভুল বলে উড়িয়ে দেন।মাঝখানে ভারতীয় ভূখণ্ডে বিচ্ছিন্ন দুই অঞ্চলকে এক রাষ্ট্রে বাঁধার সিদ্ধান্ত, যার মাশুল গুনতে হয়েছে পরের পঁচিশ বছর।
এপ্রিল-মে ১৯৪৭সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসুর অখণ্ড স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা। ২৬ এপ্রিল মাউন্টব্যাটেন জানতে চাইলে জিন্নাহ বলেন, বাংলা অখণ্ড ও স্বাধীন থাকলে তিনি খুশিই হবেন। কংগ্রেস বাংলাকে কেবল ভারতীয় ইউনিয়নের ভেতরেই অখণ্ড রাখতে রাজি ছিল; পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।বাংলার স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসত্তা মেনে নিতে জিন্নাহ অন্তত একবার প্রস্তুত ছিলেন। এটিও ইতিহাসের অংশ।
১৪ আগস্ট ১৯৪৭পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়।এই সীমানাই পরে বাংলাদেশের সীমানা।
২১ ও ২৪ মার্চ ১৯৪৮রেসকোর্স ময়দানের নাগরিক সংবর্ধনায় এবং কার্জন হলের সমাবর্তনে জিন্নাহ ঘোষণা করেন, রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়। ভিন্নমতকে আখ্যা দেন 'পঞ্চম বাহিনী'র চক্রান্ত। কার্জন হলে ছাত্ররা মুখের ওপর 'না, না' ধ্বনিতে প্রতিবাদ জানায়। দুই দিন পর শেরেবাংলা ফজলুল হক প্রকাশ্যে বলেন, জিন্নাহর ভাষা শোভন ছিল না, উর্দুর প্রশ্নে তাঁর অবস্থানও ভুল।ভাষা আন্দোলনের সূচনা, যার পরিণতি ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি, এবং শেষ পর্যন্ত একাত্তর।
১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮জিন্নাহর মৃত্যু।ভাষা প্রশ্নে অবস্থান অপরিবর্তিত রেখেই।

জিন্নাহর পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি হলো: পাকিস্তান না হলে পূর্ববঙ্গ ভারতের একটা প্রদেশ হয়েই থেকে যেত, পশ্চিমবঙ্গের মতো। এই যুক্তিতে সত্যের একটা অংশ আছে। সাতচল্লিশের ভাগাভাগি না হলে আজকের বাংলাদেশের ভূখণ্ড এভাবে তৈরি হতো না।

কিন্তু ঐতিহাসিক কার্যকারণ আর নৈতিক কৃতিত্ব এক জিনিস নয়। একটা ঘটনা আরেকটার পথ খুলে দিয়েছে বলেই প্রথম ঘটনার নায়ক দ্বিতীয়টারও নায়ক হয়ে যান না। বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে পাকিস্তানের ভেতর থেকে, কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। যে রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে লড়ে একটা জাতি স্বাধীন হলো, সেই কাঠামোর প্রতিষ্ঠাতাকে 'জাতির পিতা' বলা মানে মুক্তিযুদ্ধের কারণটাকেই অস্বীকার করা।

উল্টো দিকে, জিন্নাহর নাম শুনলেই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেওয়াও ইতিহাসচর্চা নয়। লাহোর প্রস্তাব, অখণ্ড বাংলার প্রশ্নে তাঁর ক্ষণিক নমনীয়তা, সাতচল্লিশের ভূগোল — এগুলো না বুঝলে বাংলাদেশের জন্মের পূর্বকথাই অসম্পূর্ণ থাকে। জিন্নাহ থাকবেন পাঠ্যবইয়ে, গবেষণায়, তর্কে। থাকবেন না শুধু স্মরণসভার ফুলের মালায়।

রবীন্দ্রনাথ কীভাবে 'ওদের' হয়ে গেলেন

রবীন্দ্রনাথকে যাঁরা ভারতীয় আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন, তাঁদের অনুভূতিটা ভিত্তিহীন নয়। ভুলটা অনুভূতিতে নয়, দায় কার ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে সেখানে।

একসময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পুরোপুরি এই ভূখণ্ডের নিজের। পাকিস্তান আমলে তাঁকে বেতার, টেলিভিশন আর পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় চেষ্টা হয়েছিল, এবং সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রতিরোধে। রবীন্দ্রসংগীত তখন বাঙালির প্রতিবাদের ভাষা। শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা একবার দিল্লিতে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার ভারত পেয়েছে স্বাভাবিকভাবে, আর বাংলাদেশকে তা অর্জন করতে হয়েছে কঠিন পথে।

স্বাধীনতার পরের গল্পটা আলাদা। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে প্রাসঙ্গিক রাখার সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগগুলোর পেছনে দাঁড়িয়েছে ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট। কয়েকটা উদাহরণ:

সময়উদ্যোগ
২০১০-১১দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীর যৌথ উদযাপন। ঢাকার অনুষ্ঠানে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারী উপস্থিত। পরিকল্পনায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'টেগোর চেয়ার', শিলাইদহসহ 'রবিতীর্থ' পর্যটন সার্কিট, মৈত্রী কার র‍্যালি।
২০১৬ভারতের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (আইসিসিআর)-এর 'টেগোর চেয়ার'-এ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পান। উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের পরিচালক। কাজের পরিধি: নৃত্য, সংগীত, সংস্কৃত, দর্শন ও নাট্যকলা বিভাগ।
২০১৮আইসিসিআর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের নামে একটি উর্দু চেয়ার স্থাপনের সমঝোতায় সই করে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে গুলি খেয়েছে, সেখানে রবীন্দ্রনাথের নামে উর্দু চেয়ার। ভারতের ভেতর থেকেই একে আত্মঘাতী গোল বলে সমালোচনা হয়েছে।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে একজন কবি থেকে ভারতের সাংস্কৃতিক কূটনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন। রাষ্ট্র তাঁকে সাজিয়ে-গুজিয়ে নিজেদের জাতীয়তাবাদের একটা মূর্তি বানিয়েছে, আর সেই মূর্তি পাঠানো হয়েছে সীমান্তের এপারে।

তবে এই মূর্তি একেবারে শূন্য থেকে গড়া হয়নি। কাঁচামাল জুগিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই, তাঁর জীবনের প্রথম অর্ধেকে।

সময়রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা
১৮৭৫ঠাকুর পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় চলা হিন্দু মেলায় চৌদ্দ বছরের রবীন্দ্রনাথ নিজের কবিতা 'হিন্দুমেলার উপহার' পাঠ করেন। মেলার ঘোষিত লক্ষ্য ছিল হিন্দু সভ্যতার গৌরব জাগিয়ে তোলা। বাংলাপিডিয়া নিজেই মেলার দুর্বলতা হিসেবে এর সাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছে।
১৮৯৬কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দে মাতরম্' গেয়ে শোনান, যে গানের দেবীবন্দনা নিয়ে মুসলমান সমাজের আপত্তি ছিল গোড়া থেকেই।
১৯০৪তিলকের অনুপ্রেরণায় কলকাতায় শুরু হওয়া শিবাজি উৎসবের জন্য লেখেন 'শিবাজী-উৎসব' কবিতা, যেখানে শিবাজি খণ্ডিত ভারতকে 'এক ধর্মরাজ্য'-এর পাশে বাঁধার স্বপ্নদ্রষ্টা। একই বছরের 'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধও হিন্দু সমাজকেন্দ্রিক জাতিকল্পনার দলিল হিসেবে পড়া হয়।
১৯৩২মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা 'সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ' বাতিলের দাবিতে কলকাতার প্রতিবাদসভায় যোগ দেন, বড়লাটের কাছে পাঠানো আবেদনে সই করেন। মুসলিম লীগ এই রোয়েদাদ মেনে নিয়েছিল।

আজকের হিন্দুত্ববাদীরা ঠিক এই লেখাগুলোই হাতে তুলে নেন। ২০১৫ সালে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত হিন্দু রাষ্ট্রের পক্ষে যুক্তি দিতে 'স্বদেশী সমাজ' থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে দেওয়া ভাষণে উদ্ধৃত করেছেন 'শিবাজী-উৎসব'-এর পঙ্‌ক্তি। রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতীক বানাতে তাঁদের বানোয়াট কিছু বলতে হয়নি; রবীন্দ্রনাথের নিজের অক্ষরই যথেষ্ট ছিল।

ন্যায্যতার খাতিরে গল্পের বাকি অর্ধেকটাও বলা দরকার। ১৯০৫-এর পর থেকে রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে এই পথ থেকে সরে আসেন। 'গোরা' উপন্যাসে গোঁড়া হিন্দুত্বের নায়ককেই তিনি শেষে ভেঙে দেন; ১৯১৭ সালের 'ন্যাশনালিজম' বইয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদকে মানবতার শত্রু বলেন। কিন্তু মানুষের ইতিহাসে প্রথম অর্ধেকটা মুছে যায় না। রবীন্দ্রনাথকে তাই নির্দোষ দেবতা বানানোও ভুল, আবার শুধু ওই প্রথম অর্ধেক দিয়ে তাঁকে 'বাংলাদেশবিরোধী' বানানোও ভুল। দুটোই অর্ধসত্য।

প্রশ্ন হলো, এই সময়টায় আমরা কী করেছি? যারা রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ভারতীয় আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছে, তাদের ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় ছিল বাংলাদেশের নিজের সাহিত্যের পূর্ণ প্রচার ও প্রসার। সেটা আমরা পারিনি। নিজেদের লেখকদের জন্য এই মাপের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ — বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে চেয়ার, বড় আন্তর্জাতিক উৎসব, ধারাবাহিক অনুবাদ প্রকল্প — আমরা খুব কমই নিয়েছি। ফাঁকা মাঠে অন্যের পতাকাই উড়েছে।

সবচেয়ে বড় উদাহরণ আবুল মনসুর আহমদ। 'আয়না' আর 'ফুড কনফারেন্স'-এর মতো ব্যঙ্গরচনার লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক। ১৯৬৬ সালে, স্বাধীনতার পাঁচ বছর আগেই, তিনি 'পাক-বাংলার কালচার' নামে যে বই লেখেন, পরে যা 'বাংলাদেশের কালচার' নামে পরিচিত, সেখানে তিনি পূর্ব বাংলার মানুষের আলাদা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন তুলেছিলেন। বাংলাদেশপন্থী সাংস্কৃতিক চিন্তার যে ভিত আমরা খুঁজছি, তার একটা বড় অংশ তিনি অর্ধশতাব্দী আগেই লিখে গেছেন। অথচ আমাদের সাহিত্য সমাজে, পাঠ্যক্রমে, প্রকাশনা আর আলোচনায় তাঁর উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। যে দেশ নিজের আবুল মনসুর আহমদকে চেনে না, সে দেশে অন্যের রবীন্দ্রনাথ জায়গা পাবেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ফলাফল আমাদের চোখের সামনে। যেই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য আমাদের উপভোগ করার কথা, তাঁকে আজ এক দল বয়কট করছে, আরেক দল পূজা করছে। মাঝখানে হারিয়ে গেছে পাঠক।

অভিযোগের খাতা, এবং তথ্যের জবাব

ভারতীয় আধিপত্যের ক্ষোভ যখন রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবনের ওপর গিয়ে পড়ে, তখন সত্য আর গুজব মিলেমিশে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি ঘোরা অভিযোগগুলো তথ্যের পাশে রাখলে দেখা যায়, কিছু আংশিক সত্য, কিছু পুরোপুরি বানানো, আর কিছু সত্য হলেও 'বাংলাদেশবিরোধিতা'র প্রমাণ হিসেবে অচল।

অভিযোগতথ্যের সাক্ষ্য
রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন; ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠের প্রতিবাদসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন।গল্পটির সবচেয়ে বিস্তারিত রূপ মেলে মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের ২০০০ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে, যেখানে কোনো সূত্র উল্লেখ নেই। রবীন্দ্র-নথি বলছে ভিন্ন কথা: সেদিন তিনি অসুস্থ শরীরে শিলাইদহে বিশ্রামে; ২৮ মার্চ তারিখে সেখানে বসে লেখা একটি কবিতা 'গীতিমাল্য'-তে আছে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ২০১৮ সালে প্রকাশ্যে এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলেছেন। প্রকৃত বিরোধিতা এসেছিল মূলত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের প্রভাবশালী অংশ থেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার মুসলিম সমাজ তাঁকে বর্জন করেছিল।উল্টো। ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা সফরে তিনি প্রথম তিন দিন নবাব খাজা হাবিবুল্লাহর অতিথি হয়ে বুড়িগঙ্গায় নবাবের বজরায় ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে তিনটি সংবর্ধনা দেওয়া হয়, যার একটির আয়োজক ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্ররা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিও দেয়।
তিনি শোষক জমিদার ছিলেন।জমিদার ছিলেন, এ সত্য অস্বীকারের উপায় নেই; শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে পারিবারিক জমিদারি দেখাশোনা করেছেন। তবে পতিসরে মহাজনের ঋণের ফাঁস থেকে প্রজাদের মুক্ত করতে ১৯০৫ সালে কৃষি ব্যাংক গড়েন, পরে নোবেল পুরস্কারের অর্থও সেখানে বিনিয়োগ করেন। গড়েন স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, কৃষি ও তাঁতের সমবায়। পতিসরের প্রজাদের বড় অংশ ছিলেন মুসলমান কৃষক। জমিদারি ব্যবস্থার সমালোচনা ন্যায্য। তবে শোষক ছিলেন কিনা এটা খতিয়ে দেখার বিষয়।
তিনি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন।সত্য। আর সেই বিরোধিতার আবহেই জন্ম 'আমার সোনার বাংলা'র, যার সুর তিনি নিয়েছিলেন শিলাইদহের ডাকহরকরা ও বাউল গগন হরকরার গান থেকে।

জমিদারি নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তাঁর শ্রেণি-অবস্থান যাচাই করা, তাঁর সাহিত্যে মুসলমান সমাজের উপস্থিতি কম কেন সেটা খোঁজা — এগুলো বৈধ সমালোচনা। কিন্তু ১৯৪১ সালে মারা যাওয়া একজন মানুষকে, যিনি বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের জন্ম দেখে যাননি, মিথ্যা গল্প দিয়ে 'স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধী' প্রমাণ করার চেষ্টা কোনো বিবেকবান কাজ নয়। দেয়ালে কালি ঢালার পেছনে যে অভিযোগটা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্পটাই সবচেয়ে দুর্বল। তবে জনগণের ক্ষোভ এখানে রবীন্দ্রনাথের থেকে বেশি "ভারত" শব্দের প্রতি দৃশ্যমান।

একই দাঁড়িপাল্লা: বঙ্গভঙ্গ বনাম রাষ্ট্রভাষা উর্দু

বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করলে কেউ যদি বাংলাদেশবিরোধী হন, তাহলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে চাওয়া মানুষটি কী? যুক্তির এই একটা প্রশ্নেই পুরো বয়ানটা ভেঙে পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো, ১৯০৫ সালে তিনি এমন একটা প্রশাসনিক বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন, যা পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জন্য সুবিধাজনক ছিল। এই সমালোচনার একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে: বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষক ও উঠতি মধ্যবিত্তের স্বার্থ অনেকটাই উপেক্ষিত হয়েছিল।

এবার জিন্নাহর দিকে তাকান। ১৯৪৮ সালে পূর্ববঙ্গ তখন তাঁরই রাষ্ট্রের অংশ। সেই রাষ্ট্রের বেশির ভাগ নাগরিকের ভাষা বাংলা। তিনি ঢাকায় দাঁড়িয়ে, ঢাকার ছাত্রদের মুখের ওপর বললেন, রাষ্ট্রভাষা হবে কেবল উর্দু, আর যাঁরা অন্য কথা বলছেন তাঁরা রাষ্ট্রের শত্রুদের হাতিয়ার। এটা কোনো দূরের প্রশাসনিক প্রশ্ন ছিল না। এটা ছিল একটা জনগোষ্ঠীর মুখের ভাষার ওপর সরাসরি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।

মানদণ্ডরবীন্দ্রনাথ (১৯০৫)জিন্নাহ (১৯৪৮)
বিরোধিতার লক্ষ্যবৃটিশ সরকারের প্রশাসনিক বিভাজনপূর্ববঙ্গের মানুষের ভাষার দাবি
বাংলাদেশ-রাষ্ট্রের ধারণাঅনুপস্থিতঅনুপস্থিত, তবে পূর্ববঙ্গের মানুষ তাঁরই রাষ্ট্রের নাগরিক

এই তুলনার উদ্দেশ্য জিন্নাহকে খলনায়ক বানানো নয়। উদ্দেশ্য দেখানো যে একই দাঁড়িপাল্লায় মাপলে 'বাংলাদেশবিরোধী' তকমাটা কার গায়ে বেশি আটকায়। যাঁরা বঙ্গভঙ্গ-বিরোধিতার জন্য রবীন্দ্রনাথকে খারিজ করেন, অথচ জিন্নাহর উর্দু-ঘোষণা চেপে গিয়ে তাঁর স্মরণসভা করেন, তাঁদের মাপকাঠিটা ইতিহাসের নয়, রাজনীতির। ভারতীয় আধিপত্যের প্রতি ক্ষোভ ন্যায্য হতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষোভ মেটাতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাকে নায়ক বানানো বাংলাদেশপন্থা নয়। এক আধিপত্যের জবাব আরেক আধিপত্যের স্মৃতিপূজা হতে পারে না।

এই ধরনের অযৌক্তিক যোগসূত্র টেনে টেনেই বাংলাদেশপন্থার যে মৌলিক রাজনীতি দাঁড়ানোর কথা ছিল, তা আজও দাঁড়ায়নি। বাংলাদেশপন্থা মানে ভারতবিরোধিতা নয়, পাকিস্তানপ্রীতিও নয়। বাংলাদেশপন্থা মানে এ দেশের মানুষের ভাষা, ইতিহাস ও স্বার্থকে কেন্দ্রে রাখা, আর সেই কেন্দ্র থেকে সবাইকে একই মাপে বিচার করা।

রিলস, মব আর এক মৃত মানুষের বিচার

আজকের রবীন্দ্র-বিতর্কে সবচেয়ে দুশ্চিন্তার দিক অভিযোগগুলো নয়, অভিযোগগুলো যেভাবে ছড়ায় সেটা। একটা রাজনৈতিক দলের এজেন্ডাকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় শত শত রিলস আর পোস্ট ঘুরছে। সেগুলোকেই প্রমাণ হিসেবে মেনে নিয়ে দেশের বেশির ভাগ মানুষ সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এটা দুঃখজনক।

শিল্পকলা একাডেমির ঘটনাটাই এর সবচেয়ে স্পষ্ট নমুনা। ৫ অক্টোবর ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সেগুনবাগিচার দেয়ালে দশজন বিশিষ্ট মানুষের প্রতিকৃতি আঁকে। সেই তালিকায় রবীন্দ্রনাথের পাশে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়। কয়েক দিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি লেপা হয়। যিনি কালি লেপছিলেন, তিনি সাংবাদিকদের বললেন সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প। পরে তিনি নিজেই বয়ান বদলেছেন। ঘটনাটা ঘটেছে শারদীয় দুর্গাপূজার ঠিক আগে, ফলে সাম্প্রদায়িক উসকানির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই যদি সত্যিই লড়তে হয়, তার প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা আজকের রাষ্ট্রীয় নীতি, আজকের সাংস্কৃতিক কূটনীতি। ৮৫ বছর আগে মারা যাওয়া একজন কবির মুখে কালি মাখিয়ে সেই লড়াই এক ইঞ্চিও এগোয় না। বরং যারা রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে আধিপত্যের রাজনীতি করে, তাদের হাতেই তুলে দেওয়া হয় আরেকটা প্রচারের উপাদান: দেখো, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ নিরাপদ নন।

আরেকটা কথা বলা দরকার। এই ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন। দেয়ালের ছবিতে কালি লেপা নিন্দনীয়, কিন্তু তার জবাবে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও আরেক রকমের বাড়াবাড়ি। মবের জবাব রাষ্ট্রের অতিরিক্ত শক্তি নয়। দুটোই একই সমস্যার দুই চেহারা: যুক্তির জায়গায় শক্তি দিয়ে মীমাংসা।

ইতিহাস নিয়ে ভিন্নমত থাকবেই। জাতীয় সংগীত বদলানোর প্রস্তাবও একটা রাজনৈতিক প্রস্তাব, তার পক্ষে-বিপক্ষে বলার অধিকার সবার আছে। কিন্তু সেই তর্ক হতে হবে তথ্য দিয়ে, প্রকাশ্য আলোচনায়, প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে। দেয়ালে কারও মুখে কালি মাখিয়ে কোনো জাতি তার আত্মপরিচয় খুঁজে পায় না। পায় শুধু আরেকটা ভাইরাল ভিডিও।

রবীন্দ্রনাথ বনাম নজরুল: একটা ভুল ছক

এই সমাজ বড় হয়েছে একটা বাইনারি দেখে: এক দিকে রবীন্দ্রনাথ, অন্য দিকে নজরুল। একজন হিন্দু জমিদার, আরেকজন গরিব মুসলমানের ছেলে। একজন 'ওদের', আরেকজন 'আমাদের'। অথচ ছকটা গোড়া থেকেই ভুল।

দুজনের সম্পর্কটা ইতিহাসে লেখা আছে। ১৯২১ সালের অক্টোবরে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে শান্তিনিকেতনে গিয়ে নজরুল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেন, তারপর ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত দুই দশক তাঁদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯২২ সালে নজরুলের 'ধূমকেতু' বের হয় রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী মাথায় নিয়ে। ১৯২৩ সালে নজরুল যখন রাজদ্রোহের দায়ে জেলে, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে 'বসন্ত' গীতিনাট্য উৎসর্গ করেন। হুগলি জেলে নজরুলের অনশনের খবর পেয়ে তিনি টেলিগ্রাম পাঠান: অনশন ছাড়ো, আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়। টেলিগ্রামটা অবশ্য নজরুলের হাতে পৌঁছায়নি। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর নজরুল লেখেন 'রবিহারা', নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করেন, বেতারে পাঠ করেন।

যাঁরা নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ বানান, তাঁরাও নজরুলকে পুরো সম্মান দেন না। এ দেশের এলিটদের কাছে নজরুল শ্রেণিহীন শিল্পী, তাই পুরো মর্যাদা দিতে তাঁদের বাধে। আবার ডানপন্থীদের একাংশের কাছে তিনি শ্যামাসংগীত লেখা 'বিদআতি', হিন্দু নারীকে বিয়ে করা কবি। ফলে নজরুল প্রতিপক্ষ হিসেবে দরকারি, কিন্তু পুরো মানুষ হিসেবে অস্বস্তিকর।

বাইনারিটা আরেক কারণেও টেকে না। নোবেলজয়ী এক জমিদারের প্রতিপক্ষ হিসেবে রুটির দোকানে কাজ করা গরিবের ছেলেকে দাঁড় করালে লড়াইটা শুরু থেকেই অসম দেখায়। শ্রেণির চোখে মাপলে নজরুল হারবেনই, আর সেই হারের ভয়েই না চাইতেও রবীন্দ্রনাথকে একটু বেশি শ্রদ্ধা, একটু বেশি ভক্তি দেখাতে হয়। বাইনারিটা তাই নজরুলকে বড় করে না, বরং রবীন্দ্রপূজাকেই আরও শক্ত করে। দুজনকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে একই ভাষার দুই শিখর হিসেবে পড়লেই দুজনের প্রতি সুবিচার হয়।

বয়কট নয়, পূজাও নয়

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্তি পায়নি, এই অভিযোগে সত্য আছে। কিন্তু এর দায় ১৯৪১ সালে মারা যাওয়া একজন কবির নয়। দায় আমাদের। নিজের স্বকীয়তা গড়ার বদলে আমরা যুগের পর যুগ ধরে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি করেছি। এক পক্ষ রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্নাতীত দেবতা বানিয়েছে, যাঁকে সমালোচনা করা মানেই অপরাধ। আরেক পক্ষ তার জবাবে তাঁকে শত্রু বানিয়েছে, যাঁকে অপমান করা মানেই দেশপ্রেম। দুই পক্ষই রবীন্দ্রনাথকে পড়েনি, ব্যবহার করেছে। আর এই দুই পক্ষের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় লাভ গেছে তাদের ঘরে, যারা রবীন্দ্রনাথকে আধিপত্যের পতাকা বানাতে চেয়েছে।

এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে রবীন্দ্রনাথকে এই সমাজে উপভোগ করা যায় না। হয় পূজা করতে হয়, নয় বয়কট। একজন লেখকের জন্য দুটোই অবিচার, আর পাঠকের জন্য দুটোই ক্ষতি।

এই অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ালে কারও ছবিতে কালি মেখে আসবে না, মূর্খতা দিয়েও আসবে না। মুক্তি আসবে নিজের ঘর ভরাট করে। কয়েকটা কাজ জরুরি:

  • শিলাইদহ, শাহজাদপুর আর পতিসরের রবীন্দ্রনাথকে, যিনি পূর্ববঙ্গের নদী-মাঠ-মানুষের মধ্যে বসে তাঁর অনেক শ্রেষ্ঠ লেখা লিখেছেন, বাংলাদেশের নিজের উত্তরাধিকার হিসেবে দাবি করা, কারও উপহার হিসেবে নয়।
  • নজরুলকে শ্রেণি আর মতবাদের ছাঁকনি ছাড়া পুরো মানুষ হিসেবে পড়া।
  • লালন, হাসন রাজা, আবুল মনসুর আহমদ, জসীমউদ্‌দীন, জয়নুল আবেদিন, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হুমায়ূন আহমেদসহ এই ভূখণ্ডের নিজের সৃষ্টিকে গবেষণা, অনুবাদ, পাঠ্যক্রম আর আন্তর্জাতিক প্রচারে সেই জায়গা দেওয়া, যে জায়গা ভারত রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছে।
  • ইতিহাসের প্রতিটি চরিত্রকে, জিন্নাহ থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত, একই মাপকাঠিতে বিচার করা।

একটা জাতির সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস আসে নিজের সৃষ্টির ওজন থেকে, অন্যের প্রতিকৃতি নষ্ট করার সামর্থ্য থেকে নয়। বাংলাদেশপন্থী সংস্কৃতির জ্ঞান ও প্রতিভার পূর্ণ প্রয়োগই এই মুক্তির একমাত্র পথ।

শেষ কথা

জিন্নাহ বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা অধ্যায়, পুরো বই নন। তাঁকে মুছে ফেললে চল্লিশ থেকে সাতচল্লিশের পূর্বকথা হারিয়ে যায়। তাঁকে উদযাপন করলে আটচল্লিশ থেকে একাত্তরের রক্তাক্ত উত্তরকথা অপমানিত হয়। তাঁর সঠিক জায়গা ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে, প্রেস ক্লাবের স্মরণসভায় নয়।

রবীন্দ্রনাথকে যদি আজ ভারতীয় আধিপত্যের প্রতীক বলে মনে হয়, সেই প্রতীক ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট গড়েছে রবীন্দ্রনাথের নিজের লেখার উপাদান দিয়েই, আর তাকে টিকে থাকতে দিয়েছে আমাদের নিজেদের নিষ্ক্রিয়তা। এর জবাব ১৯৪১ সালে মারা যাওয়া মানুষটির চরিত্রহনন নয়। এর জবাব নিজের সাহিত্যকে সেই উচ্চতায় তোলা, যেখানে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক কূটনীতি আমাদের আত্মপরিচয় ঠিক করে দিতে পারবে না।

বাংলাদেশপন্থা কারও বিরোধিতা দিয়ে সংজ্ঞায়িত হতে পারে না। তাকে সংজ্ঞায়িত হতে হবে নিজের মানুষ, নিজের ভাষা আর নিজের সৃষ্টি দিয়ে।

তথ্যসূত্র

"Jinnah's death anniversary observed in Dhaka with Urdu songs, poetry", ঢাকা ট্রিবিউন, সেপ্টেম্বর ২০২৪। প্রেস ক্লাবে জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী ও বক্তাদের বক্তব্য।

"National anthem sung nationwide to protest call for changing it", দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, সেপ্টেম্বর ২০২৪। জাতীয় সংগীত বদলের দাবি ও প্রতিক্রিয়া।

"Four held over defacing of Tagore graffiti in Dhaka", ঢাকা ট্রিবিউন, ১০ অক্টোবর ২০২৬। শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালচিত্র, অভিযুক্তের বক্তব্য, দশজনের প্রতিকৃতি।

"Bangladesh arrests four on sedition charges after portrait defaced", এএফপি (দ্য স্টার), ১২ অক্টোবর ২০২৬। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ ও সম্ভাব্য সাজা।

"Lahore Resolution", বাংলাপিডিয়া। ফজলুল হকের প্রস্তাব; 'রাষ্ট্রসমূহ' থেকে 'রাষ্ট্র'; আবুল হাশিমের আপত্তি।

"United Independent Bengal Movement", বাংলাপিডিয়া; ইলিয়াস চাট্টা, 'What is the use of Bengal without Calcutta?' Jinnah's Advocacy for an Independent Bengal, 1947, ২০২০। অখণ্ড বাংলা প্রশ্নে জিন্নাহ।

"Jinnah at Curzon Hall" ও "Jinnah impolite", দ্য ডেইলি স্টার। ১৯৪৮ সালের ভাষণ, ছাত্রদের প্রতিবাদ, ফজলুল হকের প্রতিক্রিয়া।

আসাহাবুর রহমান, "Rabindranath and Dhaka University", ঢাকা ট্রিবিউন, ১৪ মে ২০১৮। এম এ মতিনের দাবি, শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান, ১৯২৬ সালের ঢাকা সফর।

"Prof Anisuzzaman says claims Rabindranath opposed Dhaka University are baseless", বিডিনিউজ২৪, ২৭ জানুয়ারি ২০১৮।

"Patisar", বাংলাপিডিয়া; "A benevolent zamindar", দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস। পতিসরের জমিদারি, কৃষি ব্যাংক ও নোবেলের অর্থ।

"National Anthem", বাংলাপিডিয়া; "Before Stockholm, there was Shilaidaha", ঢাকা ট্রিবিউন। 'আমার সোনার বাংলা'র রচনা, গগন হরকরার সুর, একাত্তরে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ।

রফিকুল ইসলাম, "Islam, Kazi Nazrul", বাংলাপিডিয়া। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল সম্পর্ক, 'ধূমকেতু', 'বসন্ত', টেলিগ্রাম, 'রবিহারা'।

"Dhaka-Delhi joint celebrations start", দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, মে ২০১১; "Tagore's 150th Anniversary", দ্য ডেইলি স্টার। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীর যৌথ উদযাপন ও তার পরিকল্পনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ দপ্তর, 'Tagore Chair' নিয়োগ, ১৯ জুলাই ২০১৬।

"ICCR's misadventure with Urdu", দ্য পাইওনিয়ার, ২০১৮। রবীন্দ্রনাথের নামে উর্দু চেয়ার; রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার মন্তব্য।

"On Ravindranath Tagore's Concept of The Nation/State", মেইনস্ট্রিম উইকলি। বিশ্বভারতীতে নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য ও রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ-সমালোচনা।

"Hindu Mela", বাংলাপিডিয়া। ১৮৭৫ সালে রবীন্দ্রনাথের 'হিন্দুমেলার উপহার' পাঠ; মেলার সাম্প্রদায়িকতা।

"A short recorded history of the contentious national song Vande Mataram", স্ক্রল। ১৮৯৬ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথের 'বন্দে মাতরম্' পরিবেশন।

"On May 9, What Could Amit Shah Say on Rabindranath Tagore, the High Priest of Harmony?", জনতা উইকলি। ১৯০৫-পূর্ব হিন্দু জাতীয়তাবাদী রচনা, 'শিবাজী-উৎসব', ভাগবতের 'স্বদেশী সমাজ' উদ্ধৃতি।

বিশ্বভারতী সমাবর্তনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, ২০২১।

"আবুল মনসুর আহমদের ১২৫তম জন্মদিন আজ", দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। রচনাবলি ও 'বাংলাদেশের কালচার'।

আরোও পড়ুনঃ 

কাঠগড়ায় নজরুল: শ্রেণির চশমায় এক কবির বিচার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে যত বিতর্ক: হিন্দুত্ববাদ নাকি অসাম্প্রদায়িকতা?

Mahfuzur Rahman

লিখেছেন

Mahfuzur Rahman

লেখক সম্পর্কে আরও →

মন্তব্য

মন্তব্য

চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।

আলোচনায় যোগ দিন

মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।

এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।

PoliticsEnglish

শেখ মুজিব কেন এই বঙ্গের অপরাধী?

পঁচিশে মার্চের রাতে স্বাধীনতার খসড়ায় সই না করা মানুষটি কীভাবে যুদ্ধের একক মালিক হলেন, আর সাড়ে তিন বছরে সাম্য, মর্যাদা ও সুবিচারের অঙ্গীকার ভাঙলেন।

১৩ মিনিট২
PoliticsEnglish

বাংলা দুনিয়া: পলি, পানি ও উপসাগরের রাজনীতি

বাংলাদেশের আগামীর লড়াই পানি, পলি আর বঙ্গোপসাগরের। ফারাক্কা থেকে মেডগ, গঙ্গা চুক্তি থেকে উপকূলের লবণাক্ততা পর্যন্ত এক বিশ্লেষণ, আর বাংলা সভ্যতা ও বাংলা দুনিয়ার ধারণায় নতুন রাজনীতির প্রস্তাব।

১২ মিনিট৪৩

সংবিধান সংস্কার বনাম সংবিধান সংশোধন: পার্থক্য, প্রক্রিয়া ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

সংবিধান সংশোধন একটি আইনি পদ্ধতি, আর সংবিধান সংস্কার একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য। ১৪২ অনুচ্ছেদ, মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব, আদালতের রায় ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্তের আলোকে দুটি ধারণার পার্থক্য নিয়ে একটি বিশ্লেষণ।

৮ মিনিট৬