পূজার ছুটি চলছে। পুরো হলপাড়া নিস্তব্ধ। কমবেশি সবাই বাড়ি গিয়েছে ছুটিতে। অনেকটা সাতাইশ কি আঠাইশ রমজানের রাতের মতো লাগছে চারদিক। উৎসব উৎসব আমেজ। আজকাল আনন্দ-উৎসব দেখলে বুকের ভেতরটায় অন্যরকম লাগে। কোনো গল্প, উপন্যাস কিংবা সিনেমা ততক্ষণই ভালো লাগে যতক্ষণ সেখানে কষ্ট দেখা যায়। শেষদিকটা পূর্ণতা পেলে আর ভালো লাগে না। রাগ হয়। বেকার মানুষের আনন্দ থাকতে নেই। কোনো গল্পে সুখ দেখলে সেখানে আর নিজেকে মেলানো যায় না। মানুষ প্রায় তার শোনা সকল গল্পে নিজেরই অস্তিত্ব খোঁজে। অনুপস্থিত লাগলে মন খারাপ হওয়াটা অস্বাভাবিক না।
গ্রামে পুরোনো শাড়ি দিয়ে কাঁথা সেলাইয়ের রেওয়াজ ছিল। ছোটবেলায় নানিকে কাঁথা সেলাই করতে দেখতাম। মাকেও দেখতাম। সেলাইয়ের কাজটা তিনি ভালো পারতেন। ঘরভর্তি কাঁথা। আমি একটা ব্যক্তিগত কাঁথা ব্যবহার করতাম সে সময়। লাল-খয়েরি রঙের। মায়ের শাড়ির কাপড় দিয়ে বানানো। একটু মোটা। আমার একটু শীত বেশি লাগত। অ্যানিমিয়া ছিল কি না জানি না। কোনো বাসায় বেড়াতে গেলে রাতে ঘুমাতে অস্বস্তি লাগত। হলে আছি বেশ অনেক দিন হলো। হলে যেদিন প্রথম উঠেছি, একটা পাতলা কম্বল কিনেছিলাম। রুমে এতগুলো মানুষ থাকতেও রাতে খুব একা লাগত। বিছানাকে পরের বাড়ি মনে হতো। বাসাতেই যেন সব শান্তি। বাসায় শান্তিতে ঘুমাতে পারার মতো রহমতে আল্লাহ আমাকে রেখেছিলেন দীর্ঘদিন। আমি এর জন্য চিরকৃতজ্ঞ থাকব।
কাভিশের গান শুনছি। এক গভীর মোহকে উদ্দেশ্য করেই এই গানের সকল অর্থ দাঁড়ায়। ভিন্ন ধরনের অনুভূতি। এখন আর চোখে ঘুম আসে না। বাসায় গেলেও না। নানাবিধ চিন্তায় জর্জরিত চোখ দুটোতে এক রাত্তির শান্তির ঘুমের জায়গা হয় না বহুদিন। রাত ৩:৩০ বাজে। গায়ে কয়েক বছর আগে বাসা থেকে নিয়ে আসা মায়ের সেলাই করে দেওয়া কাঁথা জড়ানো। হালকা শীত নেমেছে হয়তো। অ্যানিমিয়া আছে কি না এখনও জানি না।
কিছু লেখালেখি করতে বসলে আর আগের মতো লেখা যাচ্ছে না। মন-মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে জানি না। তবে এখন বুঝি বাসা কেবল ইট-পাথরের দেয়ালের কারণেই বাসা ছিল না; বাসা ছিল কারণ সেখানে মা ছিল। মায়ের যত্ন ছিল। মায়ের রান্না করা পাঙাশ মাছের তরকারি ছিল। ভুনা খিচুড়ির সাথে বেগুন ভাজি ছিল। আলুভর্তার সাথে ডাল-ভাত আর কাঁচামরিচ ছিল। জ্বর এলে মাথায় পানি দেওয়ার হাত, অসুখের দিনে মাথার পাশে কুরআন পড়ার গলা, মোনাজাতে কান্না করার চোখের পানি ছিল। পাঞ্জাবি ছিঁড়ে গেলে সুই-সুতা নিয়ে সেলাই করে দেওয়া কিংবা কুঁচকানো পাঞ্জাবি পরে বাসা থেকে বের হতে দেখলে বকা দেওয়ার মানুষটাই আমাদের বাসা। এই বাসাতে আমি নেই বহুদিন। দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দেওয়ার কেউ নেই এখানে। এখানে কেবলই আমি আছি আর সাথে মায়ের সেলাই করে দেওয়া একটা কাঁথা।
আরোও পড়ুনঃ ডেঙ্গু থেকে ফিরে





মন্তব্য
মন্তব্য
চিন্তাশীল আলোচনার জায়গা। মন্তব্য করতে সাবস্ক্রাইব করুন।
আলোচনায় যোগ দিন
মন্তব্য, উত্তর ও লাইক দিতে Google দিয়ে চালিয়ে যান — নতুন লেখাও ইমেইলে পাবেন।
এক ক্লিকেই। Google শুধু আপনার নাম ও ইমেইল জানায় — কোনো পাসওয়ার্ড বা অন্য কিছু নয়।