নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় তুমুল আলোড়ন সৃষ্টিকারী এক উপন্যাস ‘কোথাও কেউ নেই’। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাকের ভাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। সে তথাকথিত কোনো আদর্শ নায়ক নয়; সে এলাকার মাস্তান, বেকার, নিজের ছোট দলবল নিয়ে চায়ের দোকানে আড্ডা দেয় এবং এলাকার মোড়ে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে বিচার-আচার চালায়। অথচ এই আপাত-অবাঞ্ছিত চরিত্রের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক পরম কোমল, ন্যায়পরায়ণ ও পরোপকারী হৃদয়। হুমায়ূন আহমেদ বাকের ভাই চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, তথাকথিত সভ্য সমাজের মুখোশধারী ভদ্রলোকদের চেয়ে একজন মাস্তানের ভেতরের নৈতিকতা কখনো কখনো কতটা খাঁটি হতে পারে।
উপন্যাসটির বুনন মূলত মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। মুনা চরিত্রটির আত্মমর্যাদাবোধ, পারিবারিক দায়িত্ব ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া তাকে একজন বাস্তববাদী কিন্তু নিঃসঙ্গ নারীতে রূপান্তর করেছে। বাকের ভাইয়ের প্রতি মুনার এক ধরনের অপ্রকাশিত টান থাকলেও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার কারণে তা কখনো পূর্ণতা পায় না। উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র বদি, মজনু, কিংবা সমাজের উঁচুতলার সুবিধাবাদী মানুষগুলো প্রত্যেকেই সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিস্বরূপ। বিশেষ করে শেষাংশে মিথ্যা খুনের মামলায় বাকের ভাইয়ের জড়িয়ে পড়া এবং আদালতের কাঠগড়ায় সত্যের অপমৃত্যু ঘটার মুহূর্তটি পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
লেখক খুব সাধারণ ভাষায় সমাজের এক চরম নির্মম সত্যকে সামনে এনেছেন: সততা ও সরলতার কোনো স্থান সুবিধাবাদী সমাজে নেই। বাকের ভাইয়ের ফাঁসির দৃশ্য কেবল একটি চরিত্রের মৃত্যু নয়, বরং এটি গোটা বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক নৈতিকতার ওপর এক চপেটাঘাত। সংলাপের তীব্রতা এবং ঘটনার দ্রুত বাঁকবদল উপন্যাসটিকে অসাধারণ নাট্যগুণ দান করেছে। পাঠক চরিত্রগুলোর সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যায় যে বাকের ভাইয়ের পরিণতি তাদের ব্যক্তিগত শোকের মতো অনুভূত হয়। সমাজ-বাস্তবতার এমন অকৃত্রিম চিত্রায়ণ সমকালীন কথাসাহিত্যে সত্যিই বিরল।





