নরক শব্দটা শুনলে আগুনের কথা মনে পড়ে। হুমায়ূন আহমেদের নরকে কোনো আগুন নেই। আছে একটা টানাটানির সংসার, একজন ক্লান্ত বাবা, একজন চুপচাপ মা, আর কয়েকজন ভাইবোন, যারা একে অপরকে ভালোবাসে। নরকটা লুকিয়ে আছে এই ভালোবাসার ভেতরেই।
নামটাই আসলে উপন্যাসের পুরো যুক্তি। 'নন্দিত' মানে আনন্দিত, 'নরক' মানে যন্ত্রণার জায়গা। দুটো শব্দ পাশাপাশি বসে একটা প্রশ্ন তোলে: মানুষ কি তার নিজের নরককেও ভালোবাসতে পারে? এই উপন্যাসের উত্তর, পারে। এবং সেটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
গল্পটা কী নিয়ে
গল্প বলে খোকা, এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে। তার বড় বোন রাবেয়া মানসিকভাবে অসুস্থ। বয়সে বড়, কিন্তু মনে শিশু। ছোট ভাই মন্টু চুপচাপ, ভেতরে ভেতরে জমাট বাঁধা রাগের মানুষ। সংসারে আরও আছেন মাস্টার কাকা, বাড়ির আশ্রিত মানুষ, প্রায় পরিবারেরই একজন।
প্রথম অর্ধেক জুড়ে কিছুই প্রায় ঘটে না। চাকরির খোঁজ, মায়ের নীরবতা, বাবার অসহায়ত্ব, ভাইবোনের খুনসুটি। তারপর একদিন জানা যায়, অবিবাহিত রাবেয়া অন্তঃসত্ত্বা। সেখান থেকে গল্প আর থামে না। একটা অপরাধ, একটা প্রতিশোধ, আর আইনের এক নির্মম রায় পরিবারটাকে ভেঙে দেয়।
এর বেশি বলা অন্যায় হবে। এই উপন্যাসের ধাক্কাটা পাঠকের নিজের পাওয়া দরকার।
যা একে আলাদা করেছে
ভাষা চিৎকার করে না। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোও হুমায়ূন বলেন প্রায় নির্লিপ্ত গলায়। ছোট বাক্য, সাধারণ শব্দ, কোনো অলংকারের ভার নেই। ফলে বেদনাটা পাঠকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না। পাঠক নিজেই সেটা তুলে নেন। এই সংযমটাই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কাহিনির নায়ক একটা পরিবার। এখানে কোনো একক নায়ক নেই, বড় কোনো আদর্শ নেই, রাজনৈতিক স্লোগান নেই। আছে একটা সংসারের ভেতরের আবহাওয়া: কে কখন চুপ করে যায়, কে কার জন্য খাবার রেখে দেয়, কে কোন কথাটা কোনোদিন মুখে আনে না। বাংলা উপন্যাসে মধ্যবিত্ত পরিবার নতুন বিষয় নয়। কিন্তু এত অন্তরঙ্গভাবে, এত কম কথায় পরিবারকে ধরা বিরল।
হাসি আর কান্না পাশাপাশি। ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও হঠাৎ একটা মজার সংলাপ, একটা অদ্ভুত অভ্যাস, একটা খামখেয়ালি মুহূর্ত। এই হাসিটা ট্র্যাজেডিকে হালকা করে না, বরং আরও ধারালো করে। কারণ পাঠক বুঝে যান, এই মানুষগুলো সুখী হতে পারত।
রাবেয়া: নিষ্পাপতার দাম
উপন্যাসের কেন্দ্রে রাবেয়া। সে কিছু বোঝে না, কাউকে সন্দেহ করে না, সবাইকে বিশ্বাস করে। এই নিষ্পাপতাই তার সবচেয়ে বড় অরক্ষিত জায়গা।
হুমায়ূন রাবেয়াকে করুণার পাত্র বানাননি। সে প্রাণবন্ত, মজার, পরিবারের সবচেয়ে উজ্জ্বল মানুষ। ঠিক সেই কারণেই তার সঙ্গে যা ঘটে, সেটা এত অসহ্য লাগে। বইটা পাঠককে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: সমাজে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটাকে রক্ষা করার দায় কার? আর যখন ঘরের ভেতরের মানুষই বিপদ হয়ে ওঠে, তখন পরিবার নামের আশ্রয়টা আসলে কতটা নিরাপদ?
মন্টু: আইনের ন্যায় বনাম হৃদয়ের ন্যায়
মন্টুর চরিত্রটা উপন্যাসের নৈতিক কাঁটা। সে যা করে, আইনের চোখে তা অপরাধ। পাঠকের চোখে তা প্রায় অনিবার্য।
হুমায়ূন এখানে কোনো রায় দেন না। মন্টুকে নায়কও বানান না, খলনায়কও না। শুধু দেখান, একটা অসহায় পরিবারে ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ যখন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, তখন সেই বিচারের দামও পরিবারকেই দিতে হয়। আইন অপরাধীকে শাস্তি দেয়, কিন্তু অপরাধের জন্ম কোথায়, সে প্রশ্ন তোলে না। উপন্যাসটা তোলে।
দুর্বলতা: প্রথম বইয়ের কাঁচা হাত
প্রশংসার পাশাপাশি সৎ থাকা দরকার। এটা একজন তরুণ লেখকের প্রথম উপন্যাস, এবং কিছু জায়গায় তা বোঝা যায়।
- মাস্টার কাকা একমাত্রিক। গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক চরিত্রের ভেতরটা প্রায় দেখাই যায় না। তার কাজের পেছনে কোনো মনস্তত্ত্ব নেই, শুধু ঘটনা আছে।
- শেষ অংশ দ্রুত। প্রথম অর্ধেক যতটা ধীরে, যত্নে বোনা, শেষের দিকে ঘটনাগুলো ততটাই তাড়াহুড়োয় ঘটে। কয়েকটা মোড় আরেকটু জায়গা পেলে আরও গভীরে যেত।
- বাইরের পৃথিবী প্রায় অনুপস্থিত। পরিবারের দারিদ্র্য আর অসহায়ত্বের পেছনে যে বড় সমাজ-অর্থনীতি কাজ করে, উপন্যাস সেদিকে খুব একটা তাকায় না। ট্র্যাজেডিটা তাই অনেকটাই ব্যক্তিগত থেকে যায়।
- মেলোড্রামার কিনারায়। দুর্ভাগ্যগুলো একটার পর একটা আসে। সংযত ভাষা না থাকলে গল্পটা সহজেই অতিনাটকীয় হয়ে যেত। ভাষাই এটাকে বাঁচিয়েছে।
তবে এসব দুর্বলতা বইয়ের মূল অভিঘাত কমায় না। বরং মনে করিয়ে দেয়, এতটা পরিণত সংযম একজন নবীন লেখকের হাতে কতটা অস্বাভাবিক ছিল।
হুমায়ূনের পরের সব লেখার বীজ
পরে যে হুমায়ূন আহমেদকে বাংলাদেশ চিনেছে, তাঁর প্রায় সব উপাদান এই প্রথম বইতেই আছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ভেতরের জীবন, হাস্যরস আর বেদনার মিশেল, অদ্ভুত কিন্তু ভালোবাসার মতো চরিত্র, আর সহজ ভাষার ভেতরে লুকানো গভীরতা।
এমনকি নামগুলোও ফিরে এসেছে। খোকা, রাবেয়া, মন্টু পরের উপন্যাস 'শঙ্খনীল কারাগার'-এও আছে, ভিন্ন গল্পে, ভিন্ন সম্পর্কে। দুটো বই পাশাপাশি পড়লে বোঝা যায়, এই নামগুলো লেখকের কাছে কেবল নাম ছিল না। ছিল একটা পরিবারের ছাঁচ, যেটাকে তিনি বারবার নতুন করে ভেঙেছেন আর গড়েছেন।
আহমদ শরীফের মতো কঠোর সমালোচক যে বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন, সেটা কোনো কাকতাল নয়। প্রথম বইতেই বোঝা গিয়েছিল, বাংলা কথাসাহিত্যে একটা নতুন কণ্ঠ এসেছে।
শেষ কথা
'নন্দিত নরকে' বড় কোনো তত্ত্বের বই নয়। এটা একটা ছোট বাড়ির গল্প, যেখানে মানুষগুলো দরিদ্র, অসহায়, আর একে অপরকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসে। সেই ভালোবাসা তাদের বাঁচাতে পারে না। কিন্তু সেই ভালোবাসার জন্যই তাদের ধ্বংসটা এত বেদনাদায়ক।
বইটা এক বসায় পড়ে ফেলা যায়। ভুলে যাওয়া যায় না।






