একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর হঠাৎ নেমে আসা এক অপূরণীয় শূন্যতা এবং তার ফলশ্রুতিতে বছরের পর বছর বয়ে বেড়ানো প্রতীক্ষার গল্প নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘অপেক্ষা’। গল্পের সূচনা হয় অত্যন্ত সাধারণভাবে, যেখানে পরিবারের কর্তা হাসান সাহেব একদিন সকালে অফিসে যাওয়ার নাম করে বের হন এবং আর কখনো ফিরে আসেন না। কোনো লাশ পাওয়া যায় না, কোনো সংবাদের সূত্র মেলে না; তিনি কেবল হাওয়ায় মিলিয়ে যান। এই আকস্মিক নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কীভাবে তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া এবং দুই সন্তান ইমন ও সুপর্ণার গোটা জীবনকে চিরতরে ওলটপালট করে দেয়, লেখক তা অত্যন্ত মমতার সাথে তুলে ধরেছেন।
উপন্যাসের মূল সুর হলো ‘প্রতীক্ষা’। মৃত্যু মানুষকে একটি নির্দিষ্ট শোক দেয়, যা সময়ের সাথে সাথে হয়তো সয়ে যায়; কিন্তু কোনো মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া স্বজনদের জন্য এক অনন্ত যন্ত্রণার জন্ম দেয়। সুরাইয়া প্রতিদিন অপেক্ষা করেন, সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে চমকে ওঠেন, সামান্য পায়ের শব্দে ভাবেন তাঁর স্বামী হয়তো ফিরে এলেন। এই অন্তহীন অপেক্ষা একসময় মানসিক অসুস্থতা ও চূড়ান্ত অবসাদে রূপ নেয়। অন্যদিকে, পরিবারের বড় ছেলে ইমন ধীরে ধীরে অকালে বড় হয়ে ওঠে, সংসারের হাল ধরে এবং নিজের শৈশবকে বিসর্জন দিয়ে পরিবারের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। তার ভেতরের নিঃশব্দ কান্না এবং বাবার প্রতি অভিমান পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
হুমায়ূন আহমেদ মানবমনের বিষাদ এবং অমোঘ নিয়তিকে এখানে অত্যন্ত গভীরতা দিয়ে প্রকাশ করেছেন। উপন্যাসে কোনো বড় ধরনের মেলোড্রামা নেই; দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজকর্মের মধ্য দিয়েই চরিত্রগুলোর হাহাকার রূপ পেয়েছে। সংসারের টিকে থাকার লড়াই, প্রতিবেশীদের করুণামিশ্রিত দৃষ্টি এবং আত্মীয়স্বজনের দূরত্ব তৈরি হওয়া সবকিছু মিলিয়ে এক চরম বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। শেষ পর্যন্ত এই অপেক্ষার কোনো ইতিবাচক বা অলৌকিক সমাপ্তি ঘটে না, বরং জীবন যে তার নিজস্ব নিয়মে বহমান এবং ক্ষত নিয়েই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়, সেই চরম সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়।







